রাশিদা ও জয়নবের ভয়ঙ্কর স্মৃতি

25

দুপুরের সূর্য তখন উত্তাপ ছড়াচ্ছে মাথার ওপর। বালুখালী ক্যাম্পকে পেছনে রেখে রাস্তার পাশে একটি গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছেন দুই নারী। নেকাবে মুখ ঢাকা। কিছুক্ষণ পর পর চোখ মুছছে তারা। কাছে গিয়ে দেখা যায় পঞ্চাশোর্ধ দুই নারীর নেকাব ভিজে গেছে চোখের পানিতে। তিনদিন আগে বালুখালী বর্ডার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছেন তারা। দুই জা, রাশিদা ও জয়নব। দুই পরিবারের ৬ ছেলে মেয়েকে নিয়ে। এখনও মাথা গোঁজার জন্য পলিথিনের একচিলতে ঠাঁই যোগাড় করতে পারেননি। কিছু শুকনো খাবার ছাড়া ত্রাণও মেলেনি। অন্যদের কাছে জানতে পেরেছেন বেশি ত্রাণ পেতে হলে কার্ড যোগাড় করতে হবে। গত দুইদিন ছোটাছুটি করেছেন কিন্তু কোন কার্ড যোগাড় করতে পারেননি। ক্যাম্পের কোণায় পরিচিত একপরিবারের পলিথিন ঘেরা ঝুপড়িতে রয়েছে তাদের সেয়ানা চার মেয়ে। কিভাবে তৈরি করবেন একটি ঝুপড়ি আর কি খেয়ে বাঁচবেন এই দুই জা তার দিশা পাচ্ছেন না।
রাশিদা বেগম জানান, তারা উত্তর আরাকানের থানাইশকের মননামার বাসিন্দা। তার স্বামীর তিন ভাইয়ের ছিল এশান্নবর্তী পরিবার। কৃষিই ছিল তাদের আয়ের উৎস। বিশাল বাড়ি আর গোলাভরা ধান নিয়ে ছিল তাদের সচ্ছল সংসার। বহু বছর আগেই হারিয়ে যান তার ভাশুর। রাশিদা বেগমের স্বামী হারুন কৃষিকাজের পাশাপাশি মিস্ত্রি কাজ করতেন। মাদ্‌রাসায় শিক্ষকতা করতেন তার দেবর হাশিম। বড় ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর তার মেয়েদের লালন-পালন করে বিয়ে দিয়েছেন ছোটভাই মাওলানা হাশিম। রাশিদা জানান, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে হঠাৎ করেই বিপর্যয় নেমে আসে তাদের পরিবারে। দুইদিনের ব্যবধানে স্থানীয় বাজার থেকেই মিয়ানমার পুলিশ দুইভাইকে ধরে নিয়ে যায়। তারা জানতে পারেন, দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর তাদের কোন কারাগারে রাখা হয়েছে পরিবারের সদস্যরা তা জানতে পারেনি। জানার সে সুযোগও নেই মগের মুল্লুকে। তারা কি কারাবন্দি, আদৌ কি বেঁচে আছেন? রাশিদা আর জয়নবের কাছে তার কোনো উত্তর নেই। মাওলানা হাশিমের স্ত্রী জয়নব বেগম জয়নব বললেন, বহু বছর ধরেই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে রাখাইনদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। সেনাবাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় বৌদ্ধদের হাতেই ছিল সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ। তারা কথায় কথায় রোহিঙ্গাদের দেশছাড়ার হুমকি দিতো। কিন্তু জন্মভূমি ফেলে কোথায় যাবে- এমন চিন্তা থেকেই মাটি কামড়ে পড়ে ছিল রোহিঙ্গারা। তার স্বামী হাশিম মাদ্‌রাসার শিক্ষক হওয়ায় বাইরের অনেক কিছুই তাদের কানে আসতো। রোহিঙ্গাদের প্রতিবছর সচিত্র পরিচয়পত্র নবায়ন করতে হতো। প্রতিবছরই এজন্য মাথাপিছু পরিশোধ করতে হতো বার্মিজ ৫ হাজার টাকা করে। কিন্তু গত বছর কার্ডে তাদের জাতীয়তার জায়গায় বার্মিজ-এর স্থলে বাঙালি লেখা হলে সচেতন রোহিঙ্গারা তার প্রতিবাদ করে। তারা সে কার্ড নিতে অস্বীকার করলে শুরু হয় ধরপাকড়। নির্যাতনের মাধ্যমে বিচারবিহীন হত্যাকাণ্ড। তার স্বামীকে গ্রেপ্তারের ধরে নিয়ে যাওয়ার পর গ্রামে প্রচার করা হয়েছিল ভাগি (বিদ্রোহী)কে ধরা হয়েছে। এভাবে কথায় কথায় হাজার হাজার লোককে গ্রেপ্তার করেছে মিয়ানমার পুলিশ। জয়নব জানান, তার স্বামী ও ভাশুরকে গ্রেপ্তারের পর স্বামীর ছাত্র ও পরিচিতদের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ন্যূনতম কোনো সংবাদ মেলেনি। তারপরও সন্তানদের বুকে আগলে রেখে স্বামীর ভিটায় দিন কাটাচ্ছিলেন দুই জা। এই অক্টোবর ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের শেষ আশ্রয়টুকু।
রাশিদা বেগম জানান, ঈদুল আজহার আগে সেনা অভিযান শুরু হলে তিনি মেয়েদের পাঠিয়ে দেন বোনের বাড়ি। প্রথমবার যখন তাদের বাড়িতে সেনাবাহিনী আসে সেদিন দুই জা লুকিয়ে ছিলেন পাশের ধানক্ষেতে। উঁকি দিয়ে দেখেছেন সেনাবাহিনীর সঙ্গে আসা স্থানীয় রাখাইন ও মগরা কিভাবে তাদের বাড়ি লুট করে নিয়ে যাচ্ছিল। সেনা অভিযান ও লুটপাটের পর তারা ভেবেছিলেন হয়তো সেনাবাহিনী আর আসবে না। তারপর মেয়েদের বাড়ি নিয়ে আসেন। দিনের বেলা বাড়িতে থাকলেও সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই তারা ধানক্ষেতসহ আশপাশের জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নিতেন। ঈদের চৌদ্দ-পনেরদিন পর তাদের পাশের গ্রামে দ্বিতীয় দফা সেনা অভিযান হলে তারা আতঙ্কে পড়েন। কিছু স্বর্ণালঙ্কার, কয়েকটি গরু আর ছেলে মেয়েদের নিয়ে অন্যদের দেখাদেখি বাংলাদেশের দিকে রওনা দেন। কিন্তু ততদিনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাখাইনদের নৃশংসতায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এক একটি গ্রাম। এ অনিশ্চিত যাত্রায় তাদের কাছে স্বর্ণ বা গরুর চেয়ে বেশি মূল্যবান ছিল জোয়ান চারটি মেয়ের সম্ভ্রম। তাই এক জা কিছুদূর রেকি করে আসতেন তারপর সবাই মিলে সেটুকু পথ অতিক্রম করে জঙ্গলে আশ্রয় নিতেন। এমনকি তারা অগ্নিকাণ্ড ও ভাঙচুরের শিকার গ্রামগুলোতেও অবস্থান করেছেন একাধিক দিন। তাদের মনে হয়েছিল, ওইসব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া গ্রামগুলোতে হয়তো আর অভিযান হবে না। সেসব পোড়া গ্রামগুলোর বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় বারবার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন দুই জা। বাচ্চাদের দ্বিখণ্ডিত দেহ, নির্যাতনের মাধ্যমে অঙ্গ কেটে নেয়া নারীদের বীভৎস সব মৃতদেহ আর পুড়ে অঙ্গার মানুষের শরীর- কত কিছু তারা পেরিয়ে এসেছেন যাত্রাপথে। বিশেষ করে উত্তর আরাকানের ফাতিয়ার ঢালা পার হওয়ার সময় দুই জায়গায় তাদের রাস্তার ওপর পড়ে থাকা লাশ সরিয়ে সামনে এগোতে হয়েছে। সে সময় হারিয়েছে সঙ্গে আনা স্বর্ণালঙ্কার। নো-ম্যান্স ল্যান্ডেও কাটিয়েছেন একদিন-একরাত। এমন দুঃখের গল্পের মধ্যেও দুই জা বারবার আল্লাহ্‌র কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন রাখাইন বর্বরদের চোখ এড়িয়ে মেয়েদের নিয়ে সসম্মানে বাংলাদেশে ঢুকতে পারায়।
ততক্ষণে কোলে বাচ্চাসহ রাশিদার পাশে এসে দাঁড়ালেন এক তরুণী। তিনি রাশিদার হারিয়ে যাওয়া ভাশুরের মেয়ে হাসিনা বেগম। আহত স্বামীর সঙ্গে বাংলাদেশে ঢুকেছেন এক সপ্তাহ আগে। রাশিদা জানান, তিনি শুনেছেন তার দুই মেয়ে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বাংলাদেশে ঢুকেছেন। কিন্তু এখন তারা কোথায় আছেন সেটা এখনও খুঁজে বের করতে পারেননি। পলিথিনের একটি ঝুপড়ি তৈরি করে অবিবাহিত মেয়েদের আড়ালে রাখার সুযোগ হলে তারপর বিবাহিত মেয়ের পরিবারকে খুঁজবেন।
উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নারীদের অনেকের জীবনেই রয়েছে এমনসব দুঃখের গল্প। দুই রোহিঙ্গা জা রাশিদা ও জয়নবের সঙ্গে আলাপের মধ্যেই চারপাশে ভিড় করে বেশ কয়েকজন নারী ও শিশু। তাদের অনেকের হাত এগিয়ে আসছে সাহায্যের প্রত্যাশায়। তাদেরই একজন মংডুর সিকদার পাড়ার ছেনুয়ারা বেগম। তিনি জানান, আমার ভাই ছিল ব্যবসায়ী। ৮ মাস আগে হঠাৎ একদিন দোকান থেকেই তাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। থানায় যোগাযোগ করা হলেও চোখ রাঙিয়ে বলেছে, তোর ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তাকে কোন কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে সেটা জানতে পারিনি। মিয়ানমার সরকারের পুলিশ এসব তথ্য জানায় না। এ সময় পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সৈয়দ আলম নামে এক তরুণ। তিনি জানান, তার খালু বদিউল আলমের কয়েকটি জিপ গাড়ি ছিল। স্থানীয় মুসলমানরা মগের গাড়িতে না চড়ে তার খালুর গাড়িতে চড়তেন। একদিন তার গাড়ি থেকে ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু কোথায় নেয়া হয়েছে কেউ জানে না। সৈয়দ আলম বলেন, কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা পুরুষদের গ্রেপ্তারের নামে ধরে নিয়ে যাচ্ছে দেশটির পুলিশ। একবার যে গ্রেপ্তার হয় তার ভাগ্যে কি ঘটে কেউ জানে না। মেরে ফেললে তো অন্তত দাফনটা করা যায়। গ্রেপ্তারের পর তো সেটাও সম্ভব হয় না। তবে আমরা কিছুদিন আগে শুনেছিলাম, রোহিঙ্গাদের জন্য আকিয়াবে নতুন একটি কারাগার নির্মাণ করা হয়েছে। এবারের অভিযানে নির্বিচারে হত্যার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অতীতের মতো এদের ভাগ্যে কি ঘটেছে কেউ জানেন না ।

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা