রায়ে সন্তুষ্ট নন বিশ্বজিতের পরিবার “দুই আসামির ফাঁসি বহাল”

36

রাজধানীর পুরান ঢাকার দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় আসামি রফিকুল ইসলাম শাকিল ও রাজন তালুকদারকে নিম্ন আদালতে দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাইফুল ইসলাম ও কাইয়ুম মিয়া টিপুকে খালাস দিয়েছেন আদালত। আর নিম্ন আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মাহফুজুর রহমান নাহিদ, ইমদাদুল হক এমদাদ, জিএম রাশেদুজ্জামান শাওন, মীর মো. নূরে আলম লিমনের সাজা কমিয়ে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া ১৩ জনের মধ্যে গোলাম মোস্তফা ও এইচএম কিবরিয়াকে খালাস দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এ রায় ঘোষণা করেন। নিম্ন আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বাকি ১১ জন আপিল না করায় তাদের সাজা বাড়া বা কমার বিষয়ে আদালত কোনো মন্তব্য করেননি। এই ১১ জন হলেন- ইউনুস আলী, তারিক বিন জোহর তমাল, আলাউদ্দিন, ওবায়দুর কাদের তাহসিন, ইমরান হোসেন, আজিজুর রহমান, আল-আমিন, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, কামরুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন। গত ১৭ই জুলাই এ মামলায় ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে রায় ৬ই আগস্ট (গতকাল) ঘোষণা করা হবে মর্মে তা অপেক্ষমাণ রাখেন হাইকোর্ট।
২০১২ সালের ৯ই ডিসেম্বর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধের সময় পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের একটি মিছিল বের হয়। একপর্যায়ে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভেবে বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। নীরিহ বিশ্বজিৎকে হত্যা করার ওই ঘটনার খবর ও ছবি দেশ বিদেশে আলোড়ন ও নিন্দার ঝড় তোলে। মামলা দায়েরের পর তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২০১৩ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক এবিএম নিজামুল হক এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২১ আসামির মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরো এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। পরে ডেথ রেফারেন্স নথি হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে আসামিরাও সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন। পরে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। গত ১৬ই মে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে এ মামলার শুনানি শুরু হয়। ২৩শে মে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নজিবুর রহমান। আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মনসুরুল হক চৌধুরী, মো. শাহ আলম, শহীদুল ইসলাম সবুজ।
গতকাল রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, এটি (বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড) পূর্ব পরিকল্পিক হত্যাকাণ্ড না হলেও আসামিদের সম্মিলিত হামলার ফলেই বিশ্বজিতের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমান ছাত্রনেতারা দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের কর্মকাণ্ড আরো পরিশীলিত হওয়া উচিত। এ ছাড়া ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে সুরতহাল ও ময়না তদন্তের প্রতিবেদন মিল না থাকায় এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ময়নাতদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলা ছিলা কি না তা খতিয়ে দেখতে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এ বিষয়টি দেখভালের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদকে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত।
এদিকে নিম্ন আদালতে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জনসহ ৬ জন খালাস পাওয়ায় হাইকোর্টের রায়ে হতাশা ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিশ্বজিতের স্বজনরা। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বজিতের বাবা অনন্ত দাস সাংবাদিকদের বলেন, এই রায়ে আমরা যে কি দুঃখ পেয়েছি তা বলার মতো নয়। বিশ্বজিতের ভাই উত্তম দাস বলেন, এমন রায় আমরা চাইনি। আগের আদালত ৮ জনকে ফাঁসি দিলো। এখন দিল মাত্র দুইজনকে। তাহলে আগের বিচারক কি দেখে রায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন আর কি বলবো। রায়ে খালাসপ্রাপ্তদের আইনজীবীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নজিবুর রহমান বলেন, যারা আপিল করেননি তাদের ব্যাপারে আদালত কিছু বলেননি। তারা (সাজা প্রাপ্তরা) যদি আপিল করেন এবং যখন তারা আইনের আওতায় আসবেন তখনই তারা আপিলের সুযোগ পাবেন। আসামিদের মধ্যে যারা খালাস পেয়েছেন আপিল বিভাগে তাদের সাজার আবেদন করা হবে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় দেখে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

Advertisement
Print Friendly, PDF & Email
sadi