রায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি কাম্য নয়

23

সর্বোচ্চ আদালতের রায় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু রায়ের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টাপাল্টি সমাবেশ, কর্মসূচি, রায়ের ঢালাও সমালোচনা, আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা কাম্য নয় বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে বলে মনে করেন তারা। একই সঙ্গে সকল পক্ষকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিচক্ষণতার সঙ্গে এ আইনি বিষয়ের সমস্যার সমাধান করা উচিত বলে মত দেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এটি যদি শুধু একটি রায় হতো তাহলে এত অস্থিরতা, মিছিল, সমাবেশ আমরা দেখতে পেতাম না। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে রাজনৈতিক এবং অপ্রাসঙ্গিক কিছু বক্তব্য এসেছে এবং কেউ কেউ এর মধ্য থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে। তবে, এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কখনো কাম্য হতে পারে না। একই সঙ্গে রায়ে যে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো এসেছে সে ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ আদালতকেও বুঝতে হবে মীমাংসিত বিষয়গুলোকে অমীমাংসিতভাবে জিইয়ে রাখা আমাদের রাষ্ট্রের জন্য কতটুকু মঙ্গলজনক হবে। তিনি বলেন, এখন যে অবস্থা হয়েছে তাতে সকল মহলের বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। অগ্রহণযোগ্য ও অগণতান্ত্রিক কিছু ঘটুক সেটি নিশ্চই আমরা কামনা করি না। রাজনৈতিক দলের নেতাদের আরো দায়িত্বশীল বক্তব্য দেয়ার
আহ্বান জানিয়ে ড. মিজানুর রহমান বলেন, সরকারি দল হোক কিংবা বিরোধী দল- যে কোনো নাগরিকের দায়িত্বশীল বক্তব্য রাখা উচিত। অযথা এবং অপ্রাসঙ্গিক বিষয় টেনে নিয়ে আসা বাঞ্ছনীয় ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করবে না। এভাবে কথা বলেতো বিষয়টিকে আরো ঘোলাটে করা হচ্ছে। তাই, আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। উভয়পক্ষকে (আওয়ামী লীগ-বিএনপি) এ বিষয়ে আরো গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। আরো সময় দিতে হবে। কোনো অনুশীলন না করে রায় নিয়ে কোনো বক্তব্য দেয়া হবে বোকামির শামিল । তিনি বলেন, ইতিমধ্যে সরকারের মন্ত্রী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এটিই (আলোচনা) হচ্ছে সঠিক পন্থা। এভাবে আলোচনার মাধ্যমেই আমরা এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে পারি। আর রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করার মতো বড় সুযোগতো রয়ে গেছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সমালোচনা করে ড. মিজানুর রহমান বলেন, আইনমন্ত্রী বললেন রায় বিদ্বেষপ্রসূত। কিন্তু বিচার বিভাগে যাদের সংশ্লিষ্টতা বেশি তারা কেন এতদিনেও প্রধান বিচারপতিকে আস্থায় আনতে পারলেন না। কেন বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দূরত্ব সৃষ্টি হলো। কেন পারস্পরিক বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হলো? কই আগেতো এমন অবস্থা হয়নি। বিচার বিভাগ নিয়েতো অতীতে এত কথা হয়নি। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি? এখন কেন হচ্ছে? এখানে একদিকে কিন্তু তীর ছুড়লে হবে না। দেখতে হবে নির্বাহী বিভাগের তরফে কোনো ব্যর্থতা আছে কিনা। যেটা অন্যভাবে করা উচিত ছিল। তিনি আরো বলেন, প্রধান বিচারপতিতো একদিনে এমন কথা বলা শুরু করেননি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেতো আমরা এই চিত্র দেখিনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, ট্রাইব্যুনাল যেভাবে বিচার করেছে তিনি (প্রধান বিচারপতি) সেভাবেই সমর্থন দিয়ে গেছেন। তার মানে আমাদের দেখতে হবে যে কেন তিক্ততা সৃষ্টি হলো। যদি বিদ্বেষপ্রসূত হয়েই থাকে তাহলে তা কেন হলো এটি বোধহয় পর্যালোচনা করা জরুরি। রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগকেই বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে উল্লেখ করে ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগকে কিন্তু বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। কেউ যেন অন্যের এলাকায় অনুপ্রবেশ করতে না পারে। একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের ফলে নির্বাহী বিভাগ যেমন অনেক সময় স্বৈরাচারী হয়ে পড়ে তেমনি একনায়কতন্ত্রের একটি ভাব লক্ষ্য করা যায়। তেমনি বিচার বিভাগও যদি একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে তাহলে তারাও কিন্তু স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে হাজির হতে পারে। আমি কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করবো এ ধরনের কিছু যাতে না হয়। যদি সেটি হয় তাহলে সেটা গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন মানবজমিনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেন, যে কেউ রায়ের সমালোচনা করতে পারেন। আইনমন্ত্রী বা আইন কমিশনের চেয়ারম্যানও বলতে পারেন। কিন্তু সেটি করতে হবে অনমেরিটে। কিন্তু ঢালাওভাবে রায়ের সমালোচনা, পাল্টাপাল্টি সমাবেশ দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন কওে না। তারা বলতে পারেন যে রায়ের এই জায়গাতে আইন ও সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটেছে। কিন্তু রায়ের ঢালাও সমালোচনা করেতো বিচার বিভাগের ক্ষতি করতে পারেন না। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের বক্তব্যের বিষয়ে শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, উনি ওনার মতো করে বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন এসেই যায় যে, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এমন বক্তব্য দিতে পারেন কিনা? তবে, রায় সম্পর্কে তিনি তার মেরিটের মধ্যে যেসব কথাবার্তা বলেছেন তাতে আমি খারাপ কিছু দেখি না। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সার্বিকভাবে একটি ভালো রায় হয়েছে। মানুষের যে মৌলিক মানবাধিকার সেটি নিশ্চিত করার জন্য বিচারক এবং আইনজীবীরা কাজ করেছেন, সেটি প্রশংসার যোগ্য। তবে, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে কেউ যদি সংক্ষুদ্ধ হয়ে থাকেন তাহলে বিষয়টি নিয়ে তারা ইতিবাচক আলোচনা করতে পারেন। তারা বলতে পারেন যে রায়ের কোথায় কোথায় আইনি ও অন্যান্য পয়েন্টে কোন ভুল হয়েছে কিনা। কিন্তু যেভাবে রায়ের ঢালাও সমালোচনা হচ্ছে তাতে এটি দায়িত্বশীল আচরণ নয়। শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, সাধারণত আমরা রায় নিয়ে তেমন কথাবার্তা বলি না। কিন্তু এই রায়ের একটি রাজনৈতিক অভিঘাত রয়েছে। যে কারণে এই রায় নিয়ে এত কথাবার্তা হচ্ছে।