রোহিঙ্গাদের না ফেরাতে কৌশলী মিয়ানমার, অস্বস্তিতে ঢাকা

28

রোহিঙ্গাদের না ফেরাতে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তর জানিয়েছে, দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বিস্তৃত আলোচনায় ১৯৯২ সালের এপ্রিলে যে যৌথ ঘোষণা সই হয়েছিল তাকে ভিত্তি ধরেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রস্তুত নেপি’ড। স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির দপ্তরের মন্ত্রী উ চাও থিন সোয়ে’র ঢাকা সফরের পরদিন মঙ্গলবার ওই বিবৃতি আসে। মিয়ানমারের মন্ত্রী ঢাকা সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। কিন্তু এখানে তিনি কোনো কথা বলেননি। অবশ্য বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, তাদের আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে মিয়ানমার। নির্যাতনের ভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমার নাগরিকদের রাখাইনে তাদের নিজ নিজ বসতভিটায় নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরাতে দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সহায়তায় ঢাকা একটি নতুন চুক্তির প্রস্তাব করেছে এবং মিয়ানমারের মন্ত্রীর কাছে চুক্তির খসড়া হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তরের বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যের কোনো উল্লেখ নেই। উল্টো বাড়তি কিছু বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে যা ঢাকাকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকার  বৈঠকের শেষদিকে মিয়ানমারের মন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নেপি’ড সফরের আমন্ত্রণ জানান। সীমান্ত সুরক্ষা, ১৯৯২ সালের এপ্রিলের যৌথ বিবৃতি অনুসারে  যেসব রোহিঙ্গা মিয়ানমার ফিরতে চায়, তাদের যাচাইকরণ বিষয়ে পদক্ষেপ চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশের মন্ত্রীকে এই সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। এ নিয়ে ঢাকার বক্তব্য হচ্ছে ওই বৈঠকে তো নয়ই, এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের পক্ষ থেকে মন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক কোনো আমন্ত্রণপত্র দেয়া হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, ১৯৯২ সালের প্রেক্ষাপট আর আজকের পরিস্থিতি মোটেও এক নয়। সেই সময়ে রোহিঙ্গাদের হাতে কিছু ডকুমেন্ট ছিল। বাংলাদেশ তাদের শরণার্থী হিসাবে নিবন্ধন করিয়েছিল। এটি ধরেই প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরানো সম্ভব হয়েছিল। ’৯২-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বর্মী বাহিনীর বর্বর নির্যাতনে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ৩ থেকে ৪ লাখ রোহিঙ্গা। গত বছরে এসেছে ৮৭ হাজার। আর গত এক মাসে এসেছে (২৫শে আগস্টের পর) ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এদের বেশির ভাগই নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ। তাদের অনেকের পরিবারের সক্ষম পুরুষদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে অথবা নিখোঁজ। রাখাইনে তাদের বসতভিটা জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আয়োজনে এখন তাদের গ্রামগুলোর অবশিষ্ট চিহ্ন পর্যন্ত মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। কোনো মতে তারা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এসব রোহিঙ্গার হাতে কোনো ডকুমেন্টই নেই। এ অবস্থায় ১৯৯২  সালের ভিত্তি ধরে তাদের ফেরানোর ঘোষণা কেবল সময়ক্ষেপণ বলেই মনে করছেন ঢাকার কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা।  দায়িত্বশীল এক কূটনীতিক গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে বলেন, আমরা ১৯৯২’র বা ’৭৮ সালের ঘোষণা কোনো কিছুই অস্বীকার করছি না। ওই দুই ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বর্তমান বাস্তবতার আলোকে একটি নতুন এবং সহায়ক চুক্তির কথা বলেছি। তাতে পুরো বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে মিয়ানমারের মন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর আলোচনা হয়েছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত সহায়ক চুক্তির খসড়াও হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকায় এ নিয়ে মিয়ানমারের মন্ত্রী কিছু না বলে পরদিন মূল বিষয়গুলোকে এড়িয়ে স্টেট কাউন্সেলরস অফিস থেকে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে তা আমাদের চিন্তায় ফেলেছে। তাদের আন্তরিকতা নিয়ে আমাদেরও প্রশ্ন রয়েছে। অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯২ সালের ঘোষণায় রোহিঙ্গাদের ভেরিফিকেশনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ মিয়ানমারের হাতে ছিল। এখন সেটি ভিত্তি ধরা হলে ভেরিফিকেশনের পুরো প্রক্রিয়া মিয়ানমারের হাতেই থাকবে। ’৯২-এর যৌথ ঘোষণার উদ্ধৃতি দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, সেখানে ভেরিফিকেশনের জন্য শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে নিবন্ধন এবং রাখাইনে বাসিন্দা হিসেবে তাদের মিয়ানমার সরকারের মর্জি মাফিক ডকুমেন্ট হাজির করতে হবে। মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে যারা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারবে তাদেরই কেবল ফেরত নেয়া হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারের এসব শর্ত ৩৩ হাজার রেজিস্ট্রার শরণার্থী পুরোপুরি পূরণ করতে পারবে। বাকিদের জন্য কঠিন হবে।
১৯৯২’র যৌথ ঘোষণার বিস্তারিত: ১৯৯২ সালের ২৮শে এপ্রিল তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ ওহন জিয়াউ যৌথ ঘোষণায় সই করেন। ওই ঘোষণায় ১৪ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের ইয়াঙ্গুন সফর এবং ২৩ থেকে ২৮শে এপ্রিল পর্যন্ত বিস্তৃত আলোচনার উল্লেখ রয়েছে। ৭ পৃষ্ঠার ওই ঘোষণার তৃতীয় দফায় সেই সময়ে মিয়ানমারের শরণার্থীদের অবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। সেই বক্তব্যে মোটা দাগে মূলত ৪টি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। প্রথমত মিয়ানমার থেকে তাদের নাগরিকদের পালিয়ে আসা (সীমান্ত পাড়ি) অবিলম্বে বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, শরণার্থীদের তাদের আবাসস্থলে সম্মানজনক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা, তৃতীয়ত, আস্থা অর্জনের পদক্ষেপ হিসেবে সীমান্ত থেকে মিয়ানমারের সেনা প্রত্যাহার এবং চতুর্থ ও সর্বশেষ ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যৌথ ঘোষণায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে উভয়  দেশের ঐকমত্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়- উভয়পক্ষ বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে শরণার্থী সমস্যার সমাধান এবং সীমান্তে আস্থা, সৌহার্দ্য ও শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। উভয় পক্ষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতি পূর্ণাঙ্গরূপে অনুসরণে সম্মত হয়েছে। মিয়ানমার সরকার দেশটির বাসিন্দাদের বাংলাদেশে প্রবেশ ঠেকাতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। যারা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে এসেছে তাদের  স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে উৎসাহ দেবে। যাচাই প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমার নাগরিকদের নেয়া হবে। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের যেসব বাসিন্দা শরণার্থী কার্ড দ্বারা বাংলাদেশে নিবন্ধিত এবং যারা মিয়ানমারের বাসিন্দা হিসেবে প্রমাণ দিতে পারবে তাদেরকেই ফিরিয়ে নেয়া হবে। শরণার্থীদের যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তালিকা অনুযায়ী যাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব কার্ড, এই বিষয়ে মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেয়া নথি রয়েছে এবং যারা মিয়ানমারের বাসিন্দা হিসেবে ঠিকানা বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারবে তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে। মিয়ানমারের বাসিন্দা হিসেবে যারা নিজেদের প্রমাণ করতে পারবে তাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা থাকবে না। মিয়ানমার আরো নিশ্চয়তা দেয়  যে, বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তালিকার সঙ্গে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের যাচাই করা ব্যক্তিদের তালিকা প্রায় একই। উভয়পক্ষ এই প্রত্যাবাসন নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক হবে বলে একমত হয়। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়াদের তাদের বাড়িতে ও মূল জমিতে পুনর্বাসন করা হবে এবং তাদের মিয়ানমার সমাজের সদস্য হিসেবে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দেয়া হবে। উভয় দেশ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধিকে সহযোগিতা করবে। মিয়ানমারের বাসিন্দাদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ ফেরত  নেয়ার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কমানোর লক্ষ্যে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে ইউএনএইচসিআর-এর ভূমিকার স্বীকৃতি দেয় উভয়পক্ষ। মিয়ানমার পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা দেয়া হয়- বৈশ্বিক ওই সংস্থা সরকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে কাজ করবে। উভয় দেশ ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা পরিহার করা এবং স্থায়ী সমাধানে একমত হয়।
দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের সঙ্গে বৈশ্বিক চাপও রাখতে চায় ঢাকা: এদিকে রোহিঙ্গা সংকট প্রলম্বিত হবে- এমন তথ্য আগেই ছিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উন্মুক্ত বিতর্ক এবং ঢাকায় মিয়ানমারের মন্ত্রীর সফর ও নেপি’ডর বিবৃতির পর সেটি এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান। নিরাপত্তা পরিষদে চীন এবং রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে রীতিমতো বিস্মিত দেশীয় কূটনীতিকরা। তারা শঙ্কিতও। প্রশ্ন উঠেছে- জনবহুল বাংলাদেশের ওপর ৯ লাখ রোহিঙ্গার বাড়তি বোঝা লাঘবে পুরনো বন্ধু মস্কো এবং কৌশলগত অংশীদার বেইজিংয়ের সমর্থন কি আদৌ পাওয়া যাবে? তারা কি বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের প্রমাণ দিবে, নাকি এটি ‘জলাঞ্জলি’ দিয়ে বিনিময়ে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক গিট আরো শক্ত করবে? রাশিয়া ও চীনকে অনবোর্ডে আনতে দূতিয়ালি চলছে অনেকদিন ধরে। পেশাদার কূটনীতিকরা লবি করছেন। রাজনৈতিক পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। সাবেক পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সমন্বয়ে গঠিত সংসদীয় দল বেইজিং ঘুরে এসেছেন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের বৈঠক হয়েছে। ডেপুটি স্পিকারের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল সেন্ট পিটার্সবার্গ সফর করেছেন। চীন ও রাশিয়ার দূতদের সঙ্গে নিউ ইয়র্কেও সিরিজ বৈঠক হয়েছে। ঢাকা ও ইয়াঙ্গুনে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। কিন্তু মস্কো ও বেইজিংয়ের অবস্থানে সেই সব আলোচনা বা দূতিয়ালির কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। দেশীয় দূতরা বেশ বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন- ইয়াঙ্গুনে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ক’দিন আগেই বাংলাদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপে বলেছেন, রাখাইনের সব জনগোষ্ঠীরই ‘মানুষের মর্যাদা’ পাওয়া উচিত। ঢাকাস্থ রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের মনোভাবও তা-ই। ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং কিয়াংও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি অন্য কূটনীতিকদের সঙ্গে কক্সবাজার ঘুরেও এসেছেন। চীন ও রাশিয়ার দূতরা রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও মস্কোর যে অবস্থান তা ঢাকা ও ইয়াঙ্গুনের দূতদ্বয়ের মনোভাবের ঠিক উল্টো! উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। পশ্চিমা দুনিয়া একবাক্যে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেখানে চীন ও রাশিয়ার এমন অবস্থান হতাশ করেছে ঢাকাকে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রশ্নে। এ অবস্থায় গুরুতর সমস্যা হিসেবে আবর্তিত রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানে ‘কার্যকর কৌশল’ খুঁজছে ঢাকা। পেশাদার কূটনীতিকরা বলছেন, এ নিয়ে দেশ দু’টির রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠ আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং দেশটির ওপর বৈশ্বিক চাপ বাড়ানোর- উভয় পথই খোলা রাখার বিষয়ে মত এসেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পরবর্তী বৈঠকেও সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনে সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের আলোচনায় রাখাইনে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, ত্রাণকর্মীদের প্রবেশ উন্মুক্তকরণ এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকার কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক মানবজমিনকে বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে এ ধরনের আলোচনা অনেকেই আশা করেনি। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে যাতে পরিষদে উন্মুক্ত আলোচনা না হয়, সে জন্য লবিং করেছিল  মিয়ানমার। সচিব আশা করেন, আরো আলোচনা হবে। নিরাপত্তা পরিষদ একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে। অন্য এক কূটনীতিক বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার ‘সুফল’ তাৎক্ষণিক পাওয়া যায় না। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে শিগগিরই পরিষদে আরো আলোচনা হবে। ওই কূটনীতিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে তাতে এখনই এ ইস্যুতে ভারতের জোরালো সমর্থন আদায় এবং চীন ও রাশিয়াকে অন্তত ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ঢাকা। ওই ৩ দেশের সঙ্গে ব্যাপক ভিত্তিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ওই ৩ দেশে রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানো, প্রয়োজনে বিশেষ দূত পাঠানোর চিন্তাও সরকারের রয়েছে।  উল্লেখ্য, প্রায় ৩ দশক থেকে রোহিঙ্গা সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ। কিন্তু একসঙ্গে এত বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে (নবাগত প্রায় ৫ লাখ) আশ্রয় দিতে হয়নি। তাছাড়া রাখাইনের ওই জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নিধনে দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন করা হলেও এবার তাদের ওপর যেভাবে গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং লোমহর্ষক নির্যাতন হয়েছে তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আর এ কারণেই এবার ইস্যুটি বৈশ্বিক উদ্বেগে রূপ পেয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রাখাইন পরিস্থিতি এবং বিপন্ন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর ফোকাস রাখতে নিরাপত্তা পরিষদকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। একই সঙ্গে মিয়ানমারের অহেতুক উস্কানি, বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘন (এ পর্যন্ত ১৯ বার) এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্তে দুই ব্যাটালিয়ন সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও বিশ্ব সমপ্রদায়ের নজরে এনেছে ঢাকা।

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা