রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবায় আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল

27

মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। লাখ লাখ রোহিঙ্গা শিশু, নারী-পুরুষ দিনের পর দিন পাহাড়ি পথে হেঁটে, কাদামাখা পথ মাড়িয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, প্রকৃতির বিরূপতা সহ্য করে আসছে বাংলাদেশে। ফলে অধিকাংশ রোহিঙ্গাই এখন ভুগছে নানা অসুখে। জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, অপুষ্টিসহ নানা অসুখ বাসা বেঁধেছে তাদের শরীরে।
এই পরিস্থিতিতে মানবতার কল্যাণে কাজ করা আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের। গত ২৫শে সেপ্টেম্বর থেকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার থাইংখালিতে আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে।
৩০ সদস্যের স্বাস্থ্যকর্মীর দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসিন। শুধু বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নয়, ওষুধপত্রও দিচ্ছে আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল। অস্থায়ী ক্যাম্পের বাইরে আদ্‌-দ্বীনের প্যারামেডিক্স ও স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত ১৪ জনের একটি টিম ক্যাম্পে আলাদাভাবে ঘুরেও চিকিৎসা দিচ্ছে। গর্ভবতী নারীকে ডেলিভারি করাতে হবে এমন খবর পেলেই ছুটে যাচ্ছে আদ্‌-দ্বীনের অ্যাম্বুলেন্স। অস্থায়ী ক্যাম্প চালু হওয়ার পর স্থাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ট্যাংক বসিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি।
চিকিৎসা সেবা প্রদানের পাশাপাশি ঘুরে দেখেছেন আশ্রয় কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখেছেন ডা. নাহিদ ইয়াসমিন। তার অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষ। বিশেষ করে গর্ভবতী মা এবং শিশুদের অবস্থা খুবই খারাপ। অনেকেই বৃদ্ধ ও শিশু এসেছেন নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ নিয়ে। দেখা দিয়েছে চর্মরোগ। প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষার অভাবে তাদের অবস্থা দিনদিন আরো খারাপ হচ্ছে।
তিনি বলেন, যতদিন উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা থাকবে ততদিন আমরা স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রাখবো। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধপত্র দিয়ে যাবো। রোহিঙ্গাদের সুস্থ রাখাই আমাদের চ্যালেঞ্জ।
উখিয়া উপজেলার থাইংখালী এলাকায় একটি ভবন ভাড়া করে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, গাইনোকলোজি মেডিসিন বিষয়ে অভিজ্ঞ একদল ডাক্তরের নেতৃত্বে সেবিকা-প্যারামেডিক্স-মিডওয়াইফারসহ ৩০ জনের টিম কাজ করে যাচ্ছে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শুধু বিনামূল্যে চিকিৎসা নয়, ওষুধও দিচ্ছে আদ্‌-দ্বীন।

অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে ক্যাম্পে ক্যাম্পে আলাদাভাবে ঘুরেও চিকিৎসা দিচ্ছে আদ্‌-দ্বীনের প্যারামেডিক্স ও স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত ১৪ জনের টিম। কোনো ক্যাম্পে গুরুতর অসুস্থ রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে ডেলিভারি করাতে হবে- এমন কোনো খবর পেলেই ছুটে যাচ্ছে আদ্‌-দ্বীনের অ্যাম্বুলেন্স। অসুস্থ রোহিঙ্গাদের জরুরিভাবে আনা-নেয়ার জন্য চারটি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রেখেছে আদ্‌-দ্বীন কর্তৃপক্ষ। রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবা দিতে কক্সবাজারের উখিয়ায় সেবা কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, যতদিন উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা থাকবেন, ততদিন আমরা স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রাখবো এবং বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দিয়ে যাব। রোহিঙ্গাদের সুস্থ রাখাটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ।
‘রোহিঙ্গাদের সম্ভবত উখিয়ার বালুখালীতে ২০০০ একরের একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের সেখানে নেয়ার পর আমরাও অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র সিভিল সার্জনের অনুমতি নিয়ে সেখানে নিয়ে যাব। ’
গত ২৫শে সেপ্টেম্বর থেকে থাইংখালীতে অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ট্যাংক বসিয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ট্যাংক বসিয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে
গর্ভবতী ও প্রসূতি এবং শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার ওপর বেশি জোর দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডা. নাহিদ ইয়াসমিন। গর্ভবতীদের নরমাল ডেলিভারির ব্যবস্থা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তিনি জানান, গর্ভবতীদের নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা, গর্ভস্থ শিশুর হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করা, ডায়াবেটিসের বিষয়টি পরীক্ষা করা, সম্ভাব্য ডেলিভারির সময় বের করা, নবজাতকের ওজন মাপাসহ বিভিন্ন সেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া জ্বর, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, চর্মরোগের চিকিৎসা ও ওষুধ দেয়া হচ্ছে। শিশুদের কৃমির উপদ্রব যাদের আছে তাদেরও চিকিৎসা চলছে। বয়স্কদের ডায়রিয়া, অ্যাজমা ও অতি ডিহাইড্রেশনের চিকিৎসা চলছে।
শিশুরা জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টে ভুগছে। ডায়রিয়াও হচ্ছে। শিশু থেকে বয়স্ক সবাই শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছে। চর্মরোগও আছে। এইসব রোগীই আমরা বেশি পাচ্ছি। আসলে এরা খালি পায়ে হাঁটছে। বৃষ্টিতে ভিজছে। এজন্য এসব রোগ বেশি হচ্ছে।’ স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলার পর থেকে প্রচুর রোহিঙ্গা চিকিৎসা নিতে আসছেন আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালে। গত পাঁচদিনে আদ্‌-দ্বীনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৬০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ নিয়েছেন।
আদ্‌-দ্বীনের স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা থাকছে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। আর অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থাকছে ২৪ ঘণ্টা।
তিনি বলেন, এখানকার প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিরাপদ পানি সরবরাহ, প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষা দেয়া, স্যানিটেশন বিশেষ করে টয়লেটের ব্যবস্থা করা। গর্ভবতী মায়েদের নিরাপদ ডেলিভারির ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা। গর্ভবতী মায়েদের চেকআপের ব্যবস্থা ও রেফারাল সিস্টেমের মধ্যে আনা।
তিনি বলেন, সরকারের যেসব টিকা দান কর্মসূচি রয়েছে তার আওতায় সদ্যজাত শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের ব্যবস্থা করা।
বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক আদ্‌-দ্বীনের অস্থায়ী সেবাকেন্দ্র নিয়ে বলেন, ইতিমধ্যে এই কাজগুলো আমরা কক্সবাজারে শুরু করেছি অস্থায়ী কেন্দ্রের মাধ্যমে। চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছি। দুই জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী দল কাজ করছে জেলা প্রশাসনের সহায়তায়। শুরু থেকে ৫ দিনে আমরা প্রায় ৬০০ জনের বেশি রোগীকে সেবা দিয়েছি।
তার অভিজ্ঞার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি দেখলাম রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশে এসেছে তাদের মধ্যে বেশির ভাগই মা ও শিশু। গর্ভবতী মায়ের সংখ্যাও অনেক। প্রায় ৪০ শতাংশ গর্ভবতী মা।
চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে- এদের চেকআপের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা। নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে রেফারাল সিস্টেমে আনা। বিশেষ করে যাদের জটিলতা হতে পারে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো। যা আদ্‌-দ্বীন শুরু করেছে অ্যাম্বুলেসের মাধ্যমে। আমাদের ৫টি অ্যাম্বুলেন্স ওখানে কাজ শুরু করেছে। তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে যাচ্ছে। আমাদের লিফলেট দিচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানাচ্ছে।
এখানে সেবা নেয়া রোগীদের বেশির ভাগই শিশু। তারা ডায়রিয়া, চর্মরোগ, নিউমোনিয়া, ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা ও জ্বর নিয়ে এসেছে।
কাজ শুরুর আগে আমরা এখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানলাম যে, ডেলিভারির সময়ে অনেক মা জানতেই পারছেন না তারা কোথায় যাবেন? তাদের রাস্তায় ডেলিভারি হয়ে গেছে। এসব মায়েদের নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা করা এবং সদ্যজাত শিশুদের নিরাপদে রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। এছাড়াও অন্যন্যা শিশুদের শুধু চিকিৎসা সেবা দেয়া নয়, তাদের ওষুধপত্র দিতে পারি তাহলেই আমরা যারা কষ্ট নিয়ে এদেশে এসেছে তাদের নিরাপদে রাখতে পারবো।
তিনি বলেন, ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে যারা এসেছেন তাদের যদি সঠিক চিকিৎসা দেয়া যায় তাহলে অন্যদের মধ্যে এই রোগ ছড়াবে না।
ডা. নাহিদ ইয়াসমিন জানান, রোহিঙ্গাদের বালুখালীতে ২০০০ এককের একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে যাওয়ার পর আমরাও সিভিল সার্জনের অনুমতি নিয়ে অস্থায়ী ক্যাম্প সেখানে নিয়ে যাবো।