রোহিঙ্গারা এখন কোথায় যাবে?

38

এখানে ঢাকায় যেকোনো আলোচনায় সবার আগে আসছে রোহিঙ্গা ইস্যু। কেন এটা হচ্ছে তা বোঝা সহজ। ভারতের আধা ডজন রাষ্ট্রের চেয়ে অনেকটা ছোট দেশ বাংলাদেশ। এটা ওড়িশা রাজ্যের চেয়েও ছোট, যদিও এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব চারগুন বেশি। কমপক্ষে পাঁচ লাখ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত দেশত্যাগী রোহিঙ্গা যখন ¯্রােতের মতো এখানে আসছে, তখন দেশটি একেবারে প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছে। কিছু রোহিঙ্গাকে অস্ত্রধারীরা বা সন্ত্রাসীরা প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে অভিযোগ আছে কারো কারো।  মিয়ানমার সীমান্তের ভিতরেও তা করা হয়েছে। অন্যদের অভিযোগ, ইসলামপন্থি কিছু এনজিও বাংলাদেশে এসব রোহিঙ্গাকে উগ্রবাদী করে তুলছে।
জাতিসংঘ মহাসবিবের কাছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে রিপোর্ট দিয়েছেন মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের কমিশনার। তাতে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যে জাতি নিধন করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, পুলিশ পোস্ট ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের হামলার জবাবে তারা অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু তাদের এ দাবি একেবারে যে সত্য বা যথার্থ তা নয়। মিয়ানমার আরো দাবি করেছে, এছাড়া হিন্দুদের বাছাই করা হয়েছে, তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। (আর এটা করেছে উগ্রবাদী রোহিঙ্গারা)। প্রকৃতপক্ষে এমন অভিযোগ দেখে মনে হতে পারে ভারতে আবেগ ছড়িয়ে দেয়ার একটি কাঁচা কৌশল হিসেবে এ অভিযোগ বেছে নিয়েছে মিয়ানমার। এমনতিইে ভারতে রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুটি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান। এরপর তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অধিবাসী নন। তাছাড়া যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছে তাদের সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত করে বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। মিয়ানমারের যুক্তি হলো রোঙ্গিারা প্রকৃতপক্ষে বাঙালি। তাদেরকে মিয়ানমারে নিয়ে গিয়েছিল দুষ্টচক্রের ঔপনিবেশিকরা। তাই তাদেরকে তাদের আদি বাসস্থানে জোর করে ফেরত পাঠানোর মধ্যে কোনো অন্যায় কিছু নেই। প্রকৃত সত্য হলো, বর্মণ-আধিপত্যবাদীরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে রয়েছেন। তারা দেশের প্রায় সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমস্যা বাধিয়েই রেখেছে। কোনো এক সময় না কোনো এক সময়ে এসব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তারা গণহত্যা চালিয়েছে। ১৯৬০ এর দশকে সহায় সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তারা বহিষ্কার করেছিল তিন লাখ ভারতীয়কে।
বাংলাদেশের কর্মকর্তাদেরকে মিয়ানমার বলেছে তারা যেসব রোহিঙ্গার জাতীয় রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও তারা যে মিয়ানমারের অধিবাসী এমন কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে পারবে তার ভিত্তিতে তাদেরকে ফেরত নেবে। অর্থাৎ যাদের কাছে এসব প্রমাণ আছে শুধু তাদেরকেই মিয়ানমার ফেরত নেবে। কিন্তু সমস্যা সেখানেই। রোহিঙ্গাদেরকে তো প্রথম ধাক্কায় এমন ডকুমেন্ট দিতেই অস্বীকার করেছে সরকার। যেসব মানুষ রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর সদস্য তাদের রেজিস্ট্রেশন উন্মুক্ত রাখা হয় নি। এমন অসংখ্য রোহিঙ্গা আছেন যাদেরকে কোনো না কোন কারণ দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া, বাস্তুচ্যুত এসব মানুষ যখন দেখেছেন তাদের বাড়িঘর আগুন দেয়া হচ্ছে তখন তাদের মধ্যে এতটাই উদ্বেগ, হতাশা দেখা দিয়েছিল যে, তারা দেশ ছেড়ে পালানোর সময় আইডি কার্ড সঙ্গে আনার কথা একেবারে ভুলেই গেছেন অথবা তেমনটা মনেই হয় নি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের (ভারতের) যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তের এটাই একটি উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টর। এখন প্রতিবেশীর সঙ্গে সেই একই আচরণ করার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বা সামর্থে ঘাটতি আছে বাংলাদেশের। যেকোনো ঘটনায়ই তারা বলেন, সমস্যার সমাধান চান তারা কূটনৈতিক উপায়ে। কিন্তু পরিস্থিতি যদি মোকাবিলা করা না যায় তাহলে সবকিছু পাল্টে যেতে পারে।
এর কোনোটিই ভারতের জন্য সুখকর হবে না। বিশ্ববাসীর কাছে (মিয়ানমারের) ক্ষমতাসীন দলের দৃষ্টিভঙ্গি হলো রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়ার কারণে তারা সন্ত্রাসী। কয়েক লাখ বাংলাদেশী, সম্ভবত তাদের বেশির ভাগই মুসলিম, কয়েক দশক ধরে অবৈধভাবে বসবাস করছে ভারতে। তাহলে তাদেরকে কথা উল্লেখ করে কেন সন্ত্রাসী জিকিরের ঢেউ উঠলো না? দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে গত দুই দশকে অবৈধ কমপক্ষে ৫০ হাজার বাংলাদেশীকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ‘ম্যানেজ’ করতে পারে নি ভারত। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যা আছে। তাহলো তাদেরকে কোথায় ফেরত পাঠানো হবে? কারণ, মিয়ানমার তাদেরকে তো নিজেদের নাগরিক বলেই স্বীকার করে না।
নতুন করে সৃষ্ট এ অবস্থায় এমন একটি সঙ্কট তৈরি হয়েছে যাতে ভারতকে কঠিন অবস্থায় (এ রক অ্যান্ড এ হার্ড প্লেস) ফেলতে পারে। ভারতের চারটি রাজ্যের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গেও ভারতের পাঁচটি সীমান্ত আছে। এ দুটি প্রতিবেশীই ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নিরাপত্তার জন্য তাদের দু’পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এদেরকে অবজ্ঞা করা ভারতের জন্য কঠিন।
এক্ষেত্রে আরো একটি আতঙ্ক আছেÑ তাহলো চীন। আমাদের মন্দ দ্বিপক্ষীয় বন্ধনে (আওয়ার ব্যাড বাইল্যাটারেল টাইস) মিয়ানমার বা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ‘জিরো সাম গেম’-এ পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এ দুটি দেশের কাছেই এরই মধ্যে বড় ধরনের বিনিয়োগকারী ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে বেইজিং। এক্ষেত্রে তারা মানবাধিকার বিষয়ক ইস্যুতে এতটা উদ্বিগ্ন নয়।
এ অঞ্চলে ভারতের গুরুত্বের বিষয়টি মাথায় রেখে লোকজনকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে এতটা ক্ষিপ্ততা দেখানোর পরিবর্তে নয়া দিল্লির উচিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বলিষ্ঠ ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া। একটি নেতৃত্বদানকারী শক্তি হয়ে ওঠার মতো কথা বলা বন্ধ করার এখনই উত্তম সময়। এর পরিবর্তে উচিত একীভূত আচরণ করা। সাধারণ জ্ঞান বলে যে, যখন আপনার প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগবে, তখন আপনার নিজের স্বার্থেই তা নিভাতে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
(মনোজ যোশী। অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো। টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ)

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা