রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে শোবিজ তারকাদের ভাবনা

41

এ সময়ে দেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রোহিঙ্গা ইস্যু। দেশজুড়ে এ নিয়ে চলছে আলোচনার জোয়ার। শোবিজ অঙ্গনেও এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শোনা যাচ্ছে এখানকার বাসিন্দাদের। কেউ সরাসরি বলছেন। আবার কেউ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আশ্রয় নিচ্ছেন বিষয়টি নিয়ে নিজ নিজ মতপ্রকাশের। সেসব নিয়েই সাজানো হয়েছে এ আয়োজন। গ্রন্থনায় বিনোদন ডেস্ক

আতাউর রহমান: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কিন্তু আমাদের দেশের লোকই অধিকাংশ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর লোক আনেক বছর আগে সেখানে চলে যায়। আমার চাচাও চলে গিয়েছিলেন, যদিও আমি তাকে কখনো দেখিনি। তাহলে এত বছর পরে কেন এই আগ্রাসন তাদের ওপর? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনে হয় এটি কোনো ষড়যন্ত্র। ইতিহাসে এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে। হিটলার ২০ লাখ লোক মেরে ফেললো, আফ্রিকায় কালোদের ওপর এমনই নির্যাতন শুরু হয়। যাই হোক এটা প্রমাণ করলো বৌদ্ধ ধর্ম শুধু মুখেই বলে বিশ্বের সকল প্রাণীর কল্যাণ হোক, কিন্তু তারা সেটা বিশ্বাস করে না। আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘অচলায়তন’ নাটক করেছিলাম, সেখানে দেখতে পাই বৌদ্ধ ধর্ম বিনাশ হচ্ছে। এখন মনে হয় বাস্তবে সেই সময় এসেছে। আর আমাদের দেশের দিকে তাকালে বলতে হয় এটা উচ্চমার্গীয় মানবতার পরিচয়। তবে এর সমাধান জরুরি, প্রধানমন্ত্রী আমেরিকায় গেছেন। আশা করি তিনি কোনো সমাধানের পথ নিয়েই আসবেন।

ফারুক: রোহিঙ্গাদের পৈতৃক ভিটে থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এটা আমরা মানব না। তারা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পার হয়ে আমাদের দেশে আসছে। আমরা ভালোবাসা দিয়ে তাদের বরণ করছি। এ দেশের মানুষ ভালোবাসতে জানে এটা আমি বিশ্বাস করি। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কীভাবে মানুষকে হত্যা করেছে তা আপনারা অবগত। মিয়ানমারের নেত্রী সুচি হচ্ছে মাটির পুতুল। যারা তাকে নোবেল পুরস্কার দিয়েছেন, তারা জানেন না কোন হাতে নোবেল পুরস্কার শোভা পায়? নোবেল পুরস্কার আমাদের হাতে শোভা পায়, সু চির হাতে নয়। এমন নিষ্ঠুর নেত্রীকে ধিক্কার জানাই। আমরা রোহিঙ্গাদের দুদর্শা দেখতে চাই না আর।

আলাউদ্দিন আলী: এটি একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। কেননা, বাংলাদেশ ভৌগোলিক দিক থেকে খুবই সমৃদ্ধ একটি দেশ, এই দেশটিকে নিজেদের অধীনে নিতে চাওয়া প্রভাবশালী দেশের অভাব নেই। তাই গরিব দুটি দেশকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা যেহেতু ধর্মীয় অনুভূতিতে প্রায় অন্ধ, তাই এই দুর্বলতাকে তারা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। আমাদের উচিত হবে ধর্মকে বড় করে না দেখে দেশের সামগ্রিক উন্নতি ও অস্তিত্বের কথা চিন্তা করা।

নূতন: এই মানুষগুলোর মুখে তাকানো যায় না। অনেক কষ্ট সহ্য করছেন তারা। নির্যাতিত এসব অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে আছি আমরা। এবং সেই সঙ্গে তাদের প্রতি এমন নির্যাতনের প্রতিবাদ করছি। আমরা তাদের পাশে থাকার জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও খুব শিগগিরই যাব।

কুমার বিশ্বজিৎ: খুবই অমানবিকভাবে রাখাইনে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন চলছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নির্যাতনের ছবি দেখে শিউরে উঠি। অত্যাচারে টিকতে না পেরে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছে আমাদের দেশে। আমি মনে করি মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া উচিত। তবে তারা যেন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে যেতে না পারে, জঙ্গি তৎপরতা না করতে পারে সেদিকে সরকারের যথাযথ দৃষ্টি দিতে হবে। আর মিয়ানমার সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ দেয়া উচিত যাতে শিগগিরই এদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করে।

শিবলী মহম্মদ: শুধু যে তারা মুসলমান এজন্য নয়, একজন হিন্দু বা বৌদ্ধ হলেও মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া ও তাদের সঠিকভাবে জীবনযাপন করতে দেওয়া দরকার। তবে তারা যেন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে যেতে না পারে, জঙ্গি তৎপরতা না করতে পারে সেদিকে সরকারের প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। আর যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারকে এমনভাবে চাপ দিতে হবে যেন তারা এদের তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়।

ওমর সানী : ৭১-এর যুদ্ধ আমি ভালোভাবে দেখিনি, শুনেছি গণহত্যার কথা। ধিক্কার জানাই পাকিস্তানকে। কয়েকদিন আগে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন থেকে গিয়েছিলাম আমি রোহিঙ্গা এলাকায়। নিজের চোখে দেখে আসলাম মানুষের অসহায়ত্ব আর ক্ষুধা কাকে বলে, আসলে আমার কোনো ভাষা নেই বলার। আমাদের দেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষ। এই ২০ কোটি মানুষ থেকে যদি সামর্থ্যবান ২ লাখ মানুষ সাহায্যের হাত বাড়াই তাহলে কিন্তু রেহিঙ্গাদের কষ্ট অনেকটা লাঘব হয়। আরেকটা কথা বলতে চাই। আপনারা যারা রাজনীতি ও বিভিন্ন দল করেন তারা আমাদের মনের গভীরে রাখবেন, নির্দিষ্ট কোনো দলে রাখবেন না, আমাদের রাজনীতির বাইরে রাখবেন। আমরা সব দলের, সব মানুষের। এ দেশ ও দেশের মানুষ আমাদের। সবশেষ কথা, দেশ শান্তিতে থাকুক, শান্তিকে থাকুক রোহিঙ্গা এলাকাসহ আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষ।

শাবনূর: অন্তত চার লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জেনেছি। রাখাইনের এমন কষ্ট টিভিতে প্রতিদিনই সংবাদে দেখছি। মনটা ভালো নেই। এসব দেখার পর কোনো কাজ করতেও ভালো লাগে না আমার। আমি এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে চাই।

রিয়াজ: আমি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গর্ববোধ করি। কারণ আমার ছোট্ট দেশটি লাখ লাখ বাস্তুহারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। নির্যাতিত, অসহায় রোহিঙ্গাদের প্রতি আমি সেই সঙ্গে সমবেদনা জানাই। বিশ্বের মানবতাবাদী সংগঠনগুলোকে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে মন ভেঙে যায়। মানুষ হয়ে এটা সহ্য করা খুব কষ্টের।

চয়নিকা চৌধুরী: এবার নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের ১৭ বছরে পদার্পণ করেছি আমি। সেদিক থেকে নির্মাতা হিসেবে এদিনটি আমার আরেক জন্মদিন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সম্মানে আমি দিনটি পালন করিনি। কারণ তারা যে জীবনযাপন করছে এটা খুবই কষ্টের। আমাদের সবার তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

আঁখি আলমগীর: নিজেরাই তৃতীয় বিশ্বের একটা দরিদ্র দেশ হয়েও রোহিঙ্গাদের পাশে আমরা যেভাবে দাঁড়িয়েছি এটা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। এজন্যই আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশেষ পুরস্কারও পেয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে। আমরা তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করে রোহিঙ্গাদের পাশে থাকতে  চাই।

আনজাম মাসুদ: মিয়ানমার নিকৃষ্ট ও বর্বরতম কাজ করছে। আর বাংলাদেশ দেখিয়েছে উদারতা, মানবিকতা। এজন্য সরকার প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। তবে এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে কোনো তৃতীয় পক্ষ যেন সুবিধা নিতে না পারে এদিকে নিশ্চয়ই সরকার নজর রাখবেন।

জায়েদ খান: রোহিঙ্গারা যে বর্বরোচিত নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, তা সত্যিই সহ্য করা যায় না। আমরা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সব সমিতি বৈঠক করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছি। শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহেরও চেষ্টা করবো আমরা। আর এভাবেই এসব অসহায় মানুষদের পাশে থাকতে চাই।

বিদ্যা সিনহা মিম: আমি সব সময় দেশের কোনো দুর্যোগ বা মানুষের বিপদে নিজের জায়গা থেকে সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা করি। কিন্তু এটা কাউকে দেখাতে বা বলতেও চাই না। কারণ একজন শিল্পী হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব। রোহিঙ্গাদেরও আমি আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। তবে আমরা নিজেরাই যেহেতু দরিদ্র জাতি তাই কতদিন তাদের এই সহায়তা আমরা করতে পারব এটা প্রশ্ন থেকে যায়। আমি একজন ক্ষুদ্র শিল্পী হয়ে সমস্যার সমাধান নিয়ে কথা বলতে পারব না, এটা নীতিনির্ধারকরাই ভালো বলতে পারবেন।

ঊর্মিলা শ্রাবন্তি কর: আমি কিছুদিন খুব একটা ভালো নেই। একজন মানবতাবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ওপর যে অত্যাচার তা দেখে ভালো থাকার উপায় নেই। আমি নিজে থেকে বলতে চাচ্ছিলাম না, যেহেতু জানতে চাইছেন তাই বলছি। আমি একজন ক্ষুদ্র শিল্পী হিসেবে নিজস্ব দায়বদ্ধতা থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু করতে চাই। এজন্য আগামী ২৩ ও ২৪শে সেপ্টেম্বর কোনো শুটিং রাখিনি। এই দুটো দিন আমি চট্টগ্রামে যাব, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সময় কাটাব। বিদ্যানন্দ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে আমি যাব। আমরা খাবার ও নগদ টাকা দিয়ে তাদের কিছুটা হলেও সহায়তা করতে চাই। আর আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দুঃখ একটু হলেও ভুলিয়ে দিতে চাই।