রোহিঙ্গা যুবকরা কোথায়?

32

রোহিঙ্গা পরিবারের ‘নিখোঁজ’ পুরুষ সদস্যরা ফিরতে শুরু করেছেন। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সীমান্তে পৌঁছে দিয়ে তাদের অনেকেই ফের বার্মায় চলে গিয়েছিল। নিজেদের বসতভিটায় ফেলে আসা সহায়-সম্বল নিয়ে আসাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এমনটাই দাবি করেছেন ফিরে আসা পরিবারের সদস্যরা। তারা বলছেন, ঝোঁপ-জঙ্গলে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন। অনেকে ফেলে আসা জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পেরেছেন। অনেকে ফিরেছেন ব্যর্থ মনোরথে। বর্মীরা তাদের বাড়িঘর আগেই লুট করে নিয়েছে। অন্য জিনিসপত্রও পুড়ে ছারখার করে দিয়েছে। কেউ কেউ এসেছেন গুরুতর আহত হয়ে। পঙ্গু হয়ে যাওয়া লোকজনের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে বেশ কিছু যুবক এখনো ‘নিখোঁজ’।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বন্দিদশা থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া মংডু চনবাজারের আব্দুল আজিজ যেমনটা জানাচ্ছিলেন। কুতুপালং ক্যাম্প এলাকার পেট্রোল পাম্পের বিপরীতে একটি নির্মাণাধীন দোকানে কথা হয় তার সঙ্গে। ত্রাণের আশায় আরকান সড়কে সকাল থেকে অপেক্ষায় ছিলেন পঞ্চাশোর্র্ধ্ব ওই পুরুষ। বৃষ্টির জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন নির্মাণাধীন দোকানে। সেখানে তিনি মানবজমিনের কাছে বর্মীদের বন্দিশালা থেকে পালিয়ে আসার করুণ কাহিনী বর্ণনা করেন। রোহিঙ্গাদের স্থানীয় ভাষায় আব্দুল আজিজ বলছিলেন, ‘২০ দিন আগে আরে ধরি লই যাগই, এককান জাগাত রাখে। এডে আই বন্দি আছিলাম। পুইয়ান্দারে হইয়িদে তোরা হনপথে বাংলাদেশত যাগয়। আর হথা চিন্তা ন গরিছ। আরে মাইল্লে মারক, তোরা যাগই। আব্দুল আজিজ বলছিলেন, তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দেন। মনেপ্রাণে চেয়েছেন তার দুই ছেলে বেঁচে থাকুক। আর তাই ছেলেদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন। সঙ্গে তার স্ত্রী ও চার মেয়ে। ছেলেদের মোবাইলের দোকান ছিল চনবাজার এলাকায়। বর্মী (মগ) যুবকরা তা আগেই লুটে নেয়। আব্দুল আজিজ বলেন, ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দেওয়ার পর তিনি পালানোর পথ খুঁজছিলেন। অবশ্য তার আগেই তাকে বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন করে দুর্বল করে দেয় বর্মী যুবকরা। বাইরে ছিল সেনাবাহিনী। এক রাতে তিনি পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা পেয়ে যান। আব্দুল আজিজের ভাষায়, ‘তারা যহন আরে বাঁধি রাখি আরেক জাগাত গিয়েগই তহন আই দরি খুলি ধাই আইসসি।’ আব্দুল আজিজ বলছিলেন, সুযোগ পেয়ে তিনি তা হাতছাড়া করেননি। অনেক কষ্ট করে দুর্বল শরীর নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাতে তার ১৪ দিন লেগেছে। ওই সময়ে দিনে পাহাড়ে-জঙ্গলে আর রাতে রাস্তা পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আব্দুল আজিজ জানান, দীর্ঘ ওই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তিনি অনেক যুবকের লাশ দেখেছেন। অনেককে আহত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছেন। ঘাটে ঘাটে মগ যুবকদের পাহারাও তিনি দেখেছেন। তিনি বলছিলেন, শাকের নামের তার পরিচিত এক যুবকের কথা। ওই যুবকের গলায় গুলি লেগেছে। তিনি রাস্তায় কাতরাচ্ছিলেন। কিন্তু আব্দুল আজিজ তাকে ধরে দেখতে পারেননি। কারণ, পেছনে মগরা তাড়া করছিলেন। আব্দুল আজিজের কাছে প্রশ্ন ছিল রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি স্থানীয়ভাবে হারাকাহ আল ইয়াকিন নামে পরিচিত একদল যুবক রাখাইনে আর্মিদের বিরুদ্ধে লড়ছে বলে অভিযোগ আছে। এমন কোনো রোহিঙ্গা যুবক দল কি তিনি দেখেছেন? জবাবে তিন বার ‘না’ বলেন আব্দুল আজিজ। তার ভাষায় ‘না, না, না। আরা হন যুদ্ধ ন গরি। আরা যুদ্ধ গইজ্জম কি লই? আরার হাছে ত এক্কান দ অ নাই। এডে মগ অক্কল লম্বা লম্বা দ লই মুসলমান অক্কলরে দোরাই। ইতারা হদে বাঁচি ত মন হইলে তোরা বাংলাদেশত যাগই।’ আব্দুল আজিজ বলছিলেন, সেখানে প্রতিরোধ গড়ার কোনো পরিবেশ নেই। বর্মী যুবকরা এবং সেনাবাহিনী একতরফাভাবেই নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার চালাচ্ছে। তবে তাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পথও দিচ্ছে। মংডু মগ্নি পাড়া থেকে আসা মাহমুদা খাতুনের সঙ্গে কথা হয় বালুখালীস্থ হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে। এক ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি ত্রাণের জন্য রাস্তায় ছোটাছুটি করছিলেন। সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে পুরাটাই ভিজে গেছেন মাহমুদা। সঙ্গে তার ছেলেমেয়েও। ফাঁড়ির সামনে থাকা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। মাহমুদা জানান, তার স্বামী সোলেমান নিখোঁজ রয়েছেন অনেক দিন ধরে। তিনি পালিয়ে আসতে পারলেও তার স্বামী আসতে পারেননি। শুনেছেন সেনাবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে গেছে। তিনি জীবিত না মৃত সে খবরও পাচ্ছেন না মাহমুদা। কুতুপালং ক্যাম্পে থাকা আলমাছ খাতুনের জীবনে ঘটে গেছে এক বিশাল ট্র্যাজেডি। তার স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে বর্মী বাহিনী। আলমাছ খাতুন তার পরিচিতজনদের সঙ্গে বাংলাদেশে পাড়ি দিতে পেরেছেন। এখন তিনি এখানেই থাকতে চান। আলমাছ খাতুনের সঙ্গে কথা বলার সময় অন্য এক রোহিঙ্গা নারী তার জীবনের করুণ কাহিনীর বর্ণনা দেন। অবশ্য তিনি তার পরিচয় দিতে রাজি হননি। অনেক চেষ্টার পরও ওই নারী তার পরিচয় দেননি। তবে তিনি জানান, তার চোখের সামনে স্বামী ও তিন ছেলেকে হত্যা করেছে বর্মীরা। দুই ছেলে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এ সময় তাদের পেছন থেকে গুলি করা হয়। কুতুপালং ক্যাম্প এলাকায় কথা হয়, সদ্য বাংলাদেশে আসা মংডুর শিলখালীর জাহেরা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, তার স্বামী গতকাল বাংলাদেশে এসেছেন আহত অবস্থায়। তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে গুলি লেগেছে। স্বামী ফিরে এসেছেন এতেই খুশি জাহেরা। তিনি বলেন, জুলুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা বাংলাদেশেই থাকতে চান। উখিয়া সদরের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ রোডের অনেক বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে নবাগত রোহিঙ্গা পরিবার। সেখানে অন্তত ৪টি পরিবারের সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের। মহিলা কলেজ সড়কের ক্যাম্পঢালা জামে মসজিদ সংলগ্ন সরওয়ার কামাল পাশার (স্থানীয় ইউপি সদস্য, রাজাপালং ইউনিয়ন) বাড়িতে ভাড়া নেয়া জামাল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, স্ত্রী, তিন ছেলে আর চার মেয়ে ছিল তার। বর্মীরা তার এক ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। ঈদের আগে এক রাতে তার বাড়ি থেকেই ছেলে নাসের (১৮)কে ধরে নেয় বর্মী বাহিনী। সকালে তার লাশ পাওয়া যায় পাশের ঝোঁপে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জামাল হোসেন বলেন, ছেলেকে নিজ হাতে দাফনের পর আর বাড়ি থাকতে মন চায়নি। বাকিদের নিয়ে কোনোমতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। জামাল হোসেন জানান, মংডুর নরুয়াবিল থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে আসার পথে অনেক রোহিঙ্গা যুবককে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছেন। কেউ মৃত, কেউবা আহত অবস্থায়। কলেজ রোডের মাহমুদ হোসেন বোতাইয়ার বাড়িতে ভাড়া নিয়েছেন সত্তরোর্ধ্ব মোহাম্মদ ছৈয়দ। মংডুর কাছে হারিবিলের বাসিন্দা। মো. ছৈয়দ জানান, তার পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদাভাবে বাংলাদেশে এসেছেন। এখন তারা একসঙ্গেই রয়েছেন। ক্যাম্পঢালা জামে মসজিদের উল্টো পাশের বাড়িতে থাকেন, নবাগত রোহিঙ্গা হাছিনা খাতুন (৫০)। বেশ কদিন হলো তিনি এখানে এসেছেন। তার ভাড়া বাড়িতে গেলে স্থানীয় সুলতানা রাজিয়ার মাধ্যমে কথা হয় ওই রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে। তার জীবনে ঘটে যাওয়া করুণ কাহিনীর বর্ণনা করছিলেন হাছিনা খাতুন। রোহিঙ্গা ভাষায় তিনি কথা বলছিলেন। অবশ্য সুলতানা রাজিয়া তা বাংলা ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। হাছিনা খাতুন জানান, ২০১২ সালে তার স্বামীকে গলা কেটে হত্যা করে বর্মীরা। কিন্তু তখনও তিনি বাড়ি ছাড়েননি। এবার আর থাকতে পারেননি। তার বাড়িঘরে আগুন, এক ছেলেকে চোখের সামনে হত্যা এবং নাতিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার পর তিনি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। হাছিনা খাতুন জানান, মংডুতে বেশ ভালোই ছিলেন তিনি। তার নয়টি মহিষ, ৮টি গরু এবং ক্ষেতখামার ছিল। তার বাড়ি ছিল, ছেলেদের ব্যবসাপাতি ছিল। আজ সব ছেড়ে এসেছেন। হাছিনা খাতুনের মেয়ে দিল কায়েস জানান, তার পরিবারের সব সদস্যই এখন বাংলাদেশে। তাদের দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। তাদের স্বামীরাও এখন বাংলাদেশে আছেন। কুতুপালং এলাকায় কথা হয় ষাটোর্ধ্ব আয়েশা খাতুনের সঙ্গে। এক ছেলে, দুই মেয়ের মা তিনি। তার ছেলে এতদিন নিখোঁজ ছিল। গতকাল মা-ছেলের দেখা হয়েছে। ছেলে এতদিন কোথায় ছিল? জানতে চাইলে আয়েশা খাতুন বলেন, ‘আই ন জানি। ও আরে সীমান্ত আনি দি গিয়ই।’ ঈদের পর পরই এক আত্মীয়ের সঙ্গে আয়েশা খাতুন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আয়েশা খাতুনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার ছেলে কি এত দিন মিয়ানমারে বর্মী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ছিল? জবাবে তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, আমরা যুদ্ধ করব কেন। নিজের জান নিয়েই আসতে অনেক কষ্ট হয়েছে। পথে পথে কত লোক মারা গেছে। বৃদ্ধ বলেন হয়তো আমি বেঁচে আছি।

 

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা