লজ্জারও লজ্জা আছে; কিন্তু আমাদের?

47

মানিক দত্ত: যে কোন সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি। কিন্তু দিনে দিনে সে শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। লজ্জাবোধটুকু যেন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা লজ্জাহীন হয়ে পড়ছি। লজ্জা বিবেক সবকিছু ভুলে আমরা আমাদের প্রয়োজনটাকে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছি। যেন এমন হচ্ছে “তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই”। অথচ যদি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোন অন্যায় করে বা চুরি করে বা মিথ্যা বলে, তখন সেটা নিয়ে সমাজে সমালোচনা হয়। তার ফলে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লজ্জা পায়। আর এ লজ্জা পাবার কারণেই সেই কাজটি করা থেকে বিরত থাকে। বিবর্তনের কারণে শুধু মানুষ নয় প্রাণি জগতে যে প্রাণীগুলো দলবেধে চলে তাদের মধ্যে লজ্জার সংস্কৃতি খুঁজে পেয়েছেন জীব বিজ্ঞানীরা। যে সকল প্রাণী একলা চলে তাদের মধ্যে লজ্জাবোধ কম। দলবদ্ধ প্রাণী হিসেবে মানুষের মাঝে শারীরবৃত্তীয় এবং মানসিক ভাবেও লজ্জার শক্তিশালী বোধ গড়ে উঠেছে, যা আমাদের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয়। মানুষ যখন তৃণভূমিতে বিচরণ করত বা জঙ্গলে বাস করত তখন প্রাণী শিকার করলে তাকে সেই শিকারের মাংস দলের সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে হতো। আবার অন্যরা কেহ শিকার করলে সেও শিকারের ভাগ পেত কিন্তু কেউ যদি তার শিকার লুকিয়ে রাখতো তবে সেটা জানাজানি হলে তাকে সকলে তিরস্কার করত বা লজ্জা দিত। লজ্জা দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। অন্যায়কে লজ্জা দেয়ার মাধ্যমে সামাজিক প্রত্যাখানের এই শক্তি না থাকলে মানুষ একজন আরেক জনের সঙ্গে ক্রমেই বিভিন্ন রকম স্বার্থপর দ্বন্দে মত্ত হতো এবং লড়াইয়ের মাধ্যমেই বিরোধের নিষ্পত্তি হতো। এখনো  আমরা একত্রে চলাফেরা করি, তখন অন্যদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বা অন্যের প্রতি অন্যায় করার শাস্তি হিসেবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ভয় থাকার কথা, কিন্তু সেই ভয় আমাদের মাঝ থেকে ক্রমে ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। লজ্জা পাওয়ার ঘটনায় একজন ব্যক্তি বা কিছু ব্যক্তি বা একটি দলের মধ্যে সেই পরিবর্তনগুলো যদি না ঘটায় এবং বিভিন্ন কারণে তাদের লজ্জা পাওয়ার ক্ষমতা যদি নষ্ট হয়ে যায় তবে সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। ব্যক্তির লজ্জার প্রতিক্রিয়া না থাকলে শুধু আইন ও বিচার কখনো রাষ্ট্র ন্যায্যতা আনতে পারে না। কিন্তু কিছু মানুষের মধ্যে লজ্জার পরিমাণ কম, কেউ কেউ লজ্জার পরিবর্তে লজ্জা পাওয়ার ভয়ে নিজেকে সংবরণ করেন। কারো কারোর লজ্জাই নেই। আমরা সবসময় শুনে থাকি“ লজ্জা নারীর ভূষণ ” তা হলে কি পুরুষের লজ্জা থাকতে নেই ?। যদি ধরে নেই লজ্জা নারীর ভূষণ সেই ভূষণও  তো এখন নেই বললেই চলে। লজ্জাবতি গাছের পাতা স্পর্শ করলে সংকুচিত হয়ে যায়  সে কারণে আমরা বলে থাকি লজ্জা পেয়েছে। গাছের যদি লজ্জা থাকে আমাদের থাকছে না কেন। কিছু কিছু মানুষ নিজ স্বার্থের জন্য চরিত্রই পাল্টে ফেলছে। যারা স্বাধীনতার সময় দেশ ও দশের বিরুদ্ধে নিলজ্জ এবং নিষ্ঠুরভাবে কাজ করেছে তারা নিজের স্বর্থের জন্য স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছে ভিড়ছে তেমনি তারাও নিলজ্জভাবে কাছে রাখছে এবং সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে। লজ্জা একটি মনস্তাত্বিক বিষয়, যাকে রাজনৈতিক, আইডিওলজি, ধর্ম আচার-সংস্কার ইত্যাদি দিয়ে প্রভাবিত করা যায়। তাই লজ্জার ধারণাটি ইতিহাসের বিভিন্ন বাকে বদলেছে। বর্তমানে সিদ্ধান্ত গ্রহীতা, রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ী সহ অনেকের মধ্যে মানুষের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য লজ্জার মাত্রা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

আমাদের রাজনীতিবিদদের অনেকেই গতদিন বলেন এককথা, পরেরদিন তার সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেন, “রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই”। তার মানে তাঁদের অনেকের  মধ্যেও লজ্জা পাওয়ার ক্ষমতা নাই হয়ে যাচ্ছে। তেমনি অনেক চাকুরীজীবী ঘুষ খাচ্ছে অনেকে ধরাও খাচ্ছে তবুও লজ্জা পাচ্ছে না। আদর্শের কারণ লজ্জার প্রতিক্রিয়াকে ভোঁতা করার বিষয়টি কোনো কোনো আদর্শের তাত্বিক গুরুরা যৌতিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে একজন দার্শনিক লিও স্ট্রস। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন অধিকাংশ মানুষ ন্যায় পরায়নভাবে নিজেকে চালালে সেই উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। তাই উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য মিথ্যা বলা বা অন্যায়  কাজ করা  যাবে। ফলাফল ভালো হলে সব অন্যায় গ্রহণযোগ্য, এই যুক্তি দিয়ে লিও স্ট্রসের অনুসারীরা গণতন্ত্র এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার মতো ধারণার উপরে মিথ্যাচার ও অন্যায় আক্রমনের যৌক্তিকতা তৈরী করেন।

শেষ ভালো যার, সব ভালো তার- এই যুক্তির মাধ্যমে সমাজের তাত্বিকেরা তাদের আদর্শের অনুসারীদের মধ্যে বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাপ্ত লজ্জার ক্ষমতা ভোঁতা করে দেন এবং অন্যায় কাজ করার যৌক্তিকতা তৈরী করে দেন। ব্যক্তির সম্পদ বা ক্ষমতার লোভ বা কামনা বা প্রতিশোধ মনোবৃত্তি লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের তৈরী- অস্তিত্ব রক্ষার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি কিন্তু ব্যক্তির এই প্রবৃত্তিগুলোকে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করে সবার আগে লজ্জার অস্ত্র দিয়ে।

কিন্তু বিগত কয়েক দশকে আমাদের সমাজে ধীরে ধীরে লজ্জার মৃত্যু ঘটছে। পচন উঁচু থেকে ক্রমাগত নীচে নামছে। যে সমাজে লজ্জার মৃত্যু হয়েছে, সেই সমাজে ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে আন্তবিরোধ পশুদের মতো ক্রমে ধ্বংস হয়ে যাবে। এটা প্রাকৃতিক অনিবার্যতা। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি লজ্জাকে বিসর্জন দিয়ে, ব্যক্তির স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একটা লজ্জাহীন সমাজ গড়বো; নাকি পুনরায় কেটি সামাজিক শক্তি হিসেবে তৈরী করে ন্যায় ভিত্তিক সুষম বন্টনের সমাজ গড়ে তুলবো। কিভাবে আমরা লজ্জাহীন কাজ করছি একটু ভেবে দেখী, তার আগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আমিও কিন্তু ভূলত্রুটির উর্ধ্বে নই। লেখনিতে ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো। ছোটদের বেলায় আসি যেমন নিত্যদিনের মধ্যে অন্যতম কাজ হলো ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া। সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে ছেলেদের দাঁড়িয়ে মেয়েদের উদ্ভট উক্তি করা, যত্রতত্র মেয়েদের উত্যক্ত করা। ভীরের মধ্যে হাত গলিয়ে দেয়া। তারা এ কাজের জন্য একটুও লজ্জা পাচ্ছে না। আবার মেয়েরা এমন পোষাক পড়ে থাকেন যে দেখে লজ্জাও লজ্জা পায়। একজন মহিলাকে এমনভাবে পোষাক পরিহিত করতে হবে যেন তাকে দেখে যেন কেহ লজ্জা না পায়। উত্তেজনাপূর্ণ পোষাক না পড়েও সুন্দরের প্রকাশ ঘটানো যায়।

অনেকে কথা বার্তা এমনভাবে বলে থাকেন যাতে অনেকে বিব্রতবোধ করে, লজ্জা পায়। যার যার সম্মান রেখে কথা বলাই ভালো। আবার অনেকে আছেন লজ্জাবোধ তার নাই। কথা হলো স্বার্থ হাসিল হলেই হলো। কে কি বললো ধার ধারে না। অনেকে মিথ্যা কথা বলেও লজ্জা পান না। এ যেন তার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই জানছে সে মিথ্যা বলছে কিন্তু মিথ্যাবাদীর লজ্জা হচ্ছে না। “দুই নাম্বারী” করছেন, মানুষকে ঠকাচ্ছেন, প্রতারণা করছেন, সবাই বুঝতে পারছে লজ্জায় কিছু বলছে না। সেটা জানার পরও সেই প্রতারক লজ্জা পাচ্ছেন না। অনেকে ভেবে থাকে আমি যা করছি তা বোধহয় কেহ জানছে না কিন্তু এ ডিজিটাল যুগে মানুষ অনেক সচেতন সুতরাং গোপন রাখার সুযোগ নেই। তবে সমাজে এখনও অনেক ভালো মানুষ আছে এটা বিশ্বাস রাখতে হবে। আর সেই সকল ভালো মানুষের কারণেই দেশ ও সমাজ টিকে আছে। খেয়াল রাখতে হবে ‘৮০মন দুধে একফোঁটা গোমূত্র মিশ্রিত হলে  যেমন দুধ খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়’ তেমনি যেন খারাপ বা লজ্জাহীন লোকের জন্যে ভালো মানুষের কাজে দূর্নাম না হয়।

যত সম্ভব সেই সকল লজ্জাহীন লোক হতে এড়িয়ে চলাই ভালো।

Facebook Comments