“ষোড়শ সংশোধনীর রায় প্রকাশ” সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল

34

বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায় প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সাত বিচারপতির স্বাক্ষরের পর ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। রায়ে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ এর ২, ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ৭ উপ-অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়েছে। এতে করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আবার ফিরে এসেছে। রায়ে হাইকোর্টের কিছু মন্তব্য বাতিল করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা) মূল রায় লিখেছেন। এতে চতুর্থ সংশোধনীতে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সুুপ্রিম কোর্টের জায়গায় প্রেসিডেন্ট শব্দ সন্নিবেশন করা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অধস্তন আদালতকেও স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের স্থানে প্রেসিডেন্ট শব্দ সন্নিবেশনের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা পুরোটাই খর্ব করা হয়েছে। রায়ে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের জন্য ৩৮ দফা আচরণ বিধিও প্রণয়ন করে দেয়া হয়েছে।
রায়ের শুরুতে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এখতিয়ারের বিষয়টি উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি। যেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির হাজিরা কিংবা কোনো দলিলপত্র উদঘাটন বা দাখিল করার আদেশসহ আপিল বিভাগের নিকট বিচারাধীন যে কোনো মামলা বা বিষয়ে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের জন্য যেরূপ প্রয়োজন হতে পারে, উক্ত বিভাগ সেরূপ নির্দেশ, আদেশ, ডিক্রি বা রিট জারি করতে পারবেন। প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, বিচারাধীন যে কোনো মামলা বা বিষয়ে ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ডিক্রি বা আদেশ জারির ক্ষমতা এ কোর্টকে দেয়া হয়েছে। যা অন্য কোনো কোর্টকে দেয়া হয়নি।
প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, সংসদ কর্তৃক বিচারক অপসারণের বিধানের বিরূপ প্রভাব নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহই নেই। এটা প্রধান বিচারপতির দৈনন্দিন কাজেও বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিখেছেন। রায়ে লেখা হয়েছে, সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদেও সংশোধন আনা হয়। এতে ‘সুপ্রিম কোর্টের’ স্থলে ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দ সন্নিবেশিত হয়। এর মাধ্যমে জুডিশিয়াল সার্ভিসে কর্মরতদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্টের কাছে ন্যস্ত করা হয়। এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদিও সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান রাখা হয়েছে, তথাপি তা অর্থহীন যদি নির্বাহী বিভাগ এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টকে সহযোগিতা না করে। আবার এ অনুচ্ছেদ সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যেখানে বলা হয়েছে, অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হাইকোর্ট বিভাগের হাতে থাকবে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা লিখেছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অধস্তন আদালতকেও স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। বিচার বিভাগ এখন এমন এক বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি মাসদার হোসেন মামলার রায়ে নির্দেশনা সত্ত্বেওওসংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ কার্যকরে কিছুই করা হচ্ছে না।
রায়ে বলা হয়েছে, এটর্নি জেনারেল এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, চতুর্থ সংশোধনীর আগে অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হাইকোর্ট বিভাগের হাতে ছিল। এবং এ বিধান বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের স্থানে প্রেসিডেন্ট শব্দ সন্নিবেশনের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা পুরোটাই খর্ব করা হয়েছে এবং বাদ দেয়া হয়েছে। যে কারণে এই সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি এবং সন্নিবেশিত ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের স্কিম এটা দেখায় যে, নিম্ন আদালত পুরোপুরি স্বাধীন এবং এর নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের কাছেই থাকা উচিত। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর পর আরো ১২টি সংশোধনী হয়েছে। পঞ্চম, অষ্টম এবং ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে পর্যবেক্ষণ দেয়ার পরও কোনো সরকার এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলার বিধান নির্বাহী বিভাগের হাতে রেখে বিচার বিভাগ কখনো স্বাধীন করা সম্ভব নয়।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য আচরণ বিধিও প্রণয়ন করে দেয়া হয়েছে রায়ে। ৩৮ দফার আচরণ বিধিতে বিস্তারিত বলা হয়েছে, বিচারপতিদের কোনো কোনো আচরণ মিস কন্ডাক্ট হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচারপতিদের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিতে বারণ করা হয়েছে এতে। প্রধান বিচারপতি নির্দেশনা দিলে একজন বিচারক সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করতে বাধ্য থাকবেন। একজন বিচারপতি কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে অংশ নেবেন না। কোনো রাজনৈতিক বিষয় বা তার আদালতে বিচারাধীন বিষয় অথবা তার আদালতে উত্থাপিত হতে পারে এমন কোনো বিষয়ে তিনি মতামত দিবেন না।
২০১৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ষোড়শ সংশোধনী সংসদে পাস হয়। এ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন নয় আইনজীবী। ২০১৬ সালে ওই রিটের রায়ে সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে সরকার পক্ষ। গত ৩রা জুলাই আপিল বিভাগ ওই আপিল খারিজ করে দেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেছিল। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা ছিলেন- বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।
বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে রাখা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনের মাধ্যমে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় গিয়ে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত করেন। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আদালত অবৈধ ঘোষণা করলেও এতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিষয়টি বহাল রাখা হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনলেও তাতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২০১৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়, যাতে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা ফিরে পায় সংসদ। বিলটি পাসের পর ওই বছরের ২২শে সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।