সংলাপের আগেই হতাশা, পরামর্শ থাকবে আস্থা অর্জনের

31

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু নির্বাচন ঘিরে আস্থাহীনতা সর্বত্র। এই আস্থাহীনতা দূর করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সংলাপ শুরু করছে নির্বাচন কমিশন। আগামীকাল সোমবার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে এই কার্যক্রম। বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগে কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদের কমিশনও এ ধরনের সংলাপ করেছিল। কিন্তু তখনকার ওই সংলাপের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। তৈরি হয়েছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ইসির এই সংলাপ আয়োজন নিয়েও রয়েছে মিশ্র অভিমত। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল ও জনগণের আস্থা অর্জনই হবে কমিশনের প্রধান কাজ। সংলাপে সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে এমন পরামর্শই আসবে বলে তারা জানিয়েছেন। যদিও সংলাপে আলোচনার জন্য নির্ধারিত সময় নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতের মতো যাতে সংলাপ উদ্যোগ ব্যর্থ না হয় ইসিকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে তাদের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে হবে।
সুশীল সমাজের ৫৯ জন প্রতিনিধিকে ইতিমধ্যে চিঠি দিয়ে সংলাপে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে কমিশন। চিঠিতে সংলাপের একটি সূচিও পাঠানো হয়েছে। সূচি অনুযায়ী আমন্ত্রিত সবাই অংশ নিলে প্রত্যেকে দুই মিনিট করে কথা বলতে পারবেন। আলোচনার এই সময় বেঁধে দেয়ায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনকে তারা খোলামেলা পরামর্শ দিতে চান। এমনকি কমিশন কি করতে চায় তাও তারা শুনতে চান। সময় বেঁধে দেয়ায় আমন্ত্রিতরা বিস্তারিত পরামর্শ দেয়ার সুযোগ পাবেন না।
তারা জানিয়েছেন, সংলাপের পরও যেন লিখিতভাবে মতামত দেয়ার সুযোগ রাখে সে বিষয়ে ইসি’র কাছে তারা দাবি রাখবেন। সংলাপে আসা ও লিখিতভাবে প্রাপ্ত সুপারিশ যেন লিখিত নথি আকারে প্রকাশ করা হয় সে বিষয়েও দাবি রাখবেন তারা। আমন্ত্রিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের রোডম্যাপের চাইতে সব দল এবং জনগণের আস্থা অর্জন জরুরি। কমিশন যাতে সে উদ্যোগ নেয় তারই পরামর্শ দেয়া হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে ইসি’র কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ), সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়াল ও সীমানা পুনঃনির্ধারণ অধ্যাদেশের কপি পাঠানো হয়েছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার যে কার্যপত্র ইসি সচিবালয় চূড়ান্ত করেছে তাতে দেখা যায়, আমন্ত্রিত ৫৯ প্রতিনিধির জন্য ২ ঘণ্টা সময় রাখা হয়েছে। সেই হিসেবে ইসি’র আলোচ্যসূচির ৭টি বিষয়ে আমন্ত্রিতদের প্রত্যেকে ২ মিনিটের মতো সময় পাবেন। নাগরিক (সুশীল) সমাজের প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়ে ইসি বলেছিল, এই সভায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, আইনজীবীসহ যাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার স্বাগত ভাষণের জন্য সময় রাখা হয়েছে ১৫ মিনিট। সভা শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের জন্যও তিনি নেবেন ৫ মিনিট সময়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, সংলাপের কোনো এজেন্ডা পাননি তিনি। ইসির রোডম্যাপ পেয়েছি। দুই মিনিটে কি বলবো? আমাদের অনেক পয়েন্ট আছে। সুজন থেকে কিছু প্রস্তাবনা নিয়ে যাবো। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ইসি’র সাত দফা কর্মসূচি নিয়ে সম্ভবত কথা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই ৬০ জন বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে কথা বলে কী সমস্যাটা সমাধান হবে? সমস্যা হচ্ছে এক জায়গায়। সেটা হচ্ছে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে ইসি কি করবে, কি করতে পারে- এটাই আসল। বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে তাদের তো কোনো ভূমিকা নেই। তারা কি করবে? আমার বক্তব্য একটাই। আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে উল্লেখ করে ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ইসি কিভাবে উদ্যোগ নেবে সেটা ইসি’র ব্যাপার। আমরা কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারবো না। ইসি এটা সিদ্ধান্ত নেবে। কৌশলটা কি হবে সেটা তারাই দেখবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, সংলাপের কোনো এজেন্ডা পাইনি। সময় বরাদ্দের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি তো ফরম্যাট জানি না। দু’ঘণ্টায় কি কথা হবে? দুই মিনিটে কি কথা বলবো? ওখানে কিছু বলতে হবে- এমন কোনো কথা নেই। আমার কথা বলার ফোরামের অভাব নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ৬০ জনকে একসঙ্গে ডাকা হয়েছে। পরামর্শের জন্য দুই ঘণ্টা খুব অল্প সময়। দুই ঘণ্টার মধ্যে ৬০ জন লোক কী আলোচনা করবে? এখানে তো শুভেচ্ছা বিনিময় করতে করতে সময় চলে যাবে। ইসি’র সঙ্গে সংলাপের পরও লিখিতভাবে সুশীল সমাজের মতামত জমা নেয়ার জন্য ইসি’র প্রতি আহ্বান জানান ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ইসি যদি বলে পরবর্তী সময়ে কোনো লিখিত পরামর্শ থাকে আমরা দিতে পারবো, এরকম যদি কথা তারা বলে তাহলে এ আলোচনাটা ফলপ্রসূ হতে পারে। এক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট তারিখ দিতে পারে। এছাড়া সংলাপে যে পরামর্শ আসবে এবং পরবর্তীতে যেগুলো লিখিত দেয়া হবে সেগুলো ডকুমেন্ট বানিয়ে তারা যদি বলে এই সাজেশন পেয়েছি সেটার আলোকে তারা যদি বলে মূল সাজেশন এগুলো। তাহলে সেটা ভালো হয়।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি সংলাপে উঠতে পারে উল্লেখ করে ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের প্রার্থীদের ও ভোটারদের মনে যে প্রবল আশংকা সৃষ্টি হয়েছে গত কয়েক বছরের নির্বাচনের মাধ্যমে এই আশংকা দূর করতে হলে অবশ্যই নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। সংলাপে মনোনয়ন দাখিলের প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলবেন উল্লেখ করে ড. আসিফ নজরুল আরো বলেন, যারা নির্বাচন করতে চায় তারা যেন মনোনয়ন দাখিল করতে পারে সেজন্য ইন্টারনেট বা ই-মেইলের মাধ্যমে মনোনয়ন দাখিল করা হয়। কারণ এখন মনোনয়নপত্র দাখিল কঠিন হয়ে গেছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের পর প্রার্থীর বিরুদ্ধে যদি কোনো ক্রিমিনাল মামলা হয় তবে তার প্রসিডিউর যেন সাসপেন্ড রাখে। অর্থাৎ তাকে যেন মামলার জালে ফেলে বাধা দেয়া না হয় সে ব্যাপারে সিস্টেম ডেভেলপ করতে হবে। এ দুটো জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কম সময় হলেও মতামত জানানো সম্ভব বলে জানান জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ (জানিপপ) চেয়ারম্যান ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। তিনি বলেন- স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু বিষয় রোডম্যাপে সংযোজনের প্রস্তাব রাখবেন তিনি। ইসি সূত্রে জানা গেছে, সংলাপে রোডম্যাপ ছাড়াও আরো কিছু বিষয়ে সুশীল সমাজের মতামত নিতে পারে ইসি। বিদ্যমান ইংরেজি আইন কাঠামো বিশেষ করে ‘দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার, ১৯৭২ এবং দ্য ডিলিমিটেশন অব কনস্টিটিউয়েন্সিস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’ যুগোপযোগী করে বাংলা ভাষায় প্রণয়ন, বিগত নির্বাচনসমূহের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অবৈধ অর্থ এবং পেশীশক্তির ব্যবহার রোধকল্পে আইনি কাঠামো সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাবনা, সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণকল্পে জনসংখ্যার পাশাপাশি ভোটার সংখ্যা, সংসদীয় এলাকার আয়তন, প্রশাসনিক অখণ্ডতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ, নির্বাচন প্রক্রিয়া যুগোপযোগী ও সহজীকরণের বিষয়ে আইনি কাঠামো ও প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন, প্রবাসী ভোটারদের ভোট দান নিশ্চিত করার বিষয়ে একটি আইন কাঠামোসহ প্রক্রিয়া প্রণয়নের জন্য প্রস্তাবনা, কর্ম পরিকল্পনায় বর্ণিত অন্যান্য কাঠামোকে যুগোপযোগী করার প্রস্তাবনা, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও বিতরণ নিশ্চিত করার জন্য পরামর্শ, ভোট কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত কার্যক্রম যুগোপযোগী করার জন্য পরামর্শ, নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নিরীক্ষা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কর্মপরিকল্পনার অতিরিক্ত কোনো প্রস্তাবনা থাকলে সেই বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এরকম আলোচ্যসূচির কোনো কপি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সরবরাহ করা হয়নি বলে তারা নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ১৬ই জুলাই বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ প্রকাশ করে। এই কর্মপরিকল্পনায় সাতটি বড় বিষয়ের ওপর কার্যক্রম নেয়ার পরিকল্পনা করে এবং এর মধ্যে বড় একটা বিষয় ছিল সংলাপ। ৩১শে জুলাই সুশীল সমাজের মাধ্যমে এই সংলাপ শুরু হতে যাচ্ছে। সুশীল সমাজের ৫৯ জনের তালিকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব, সাবেক রাষ্ট্রদূত, বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, মিডিয়া ব্যক্তিত্বসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা রয়েছেন।
গত ৬ই ফেব্রুয়ারি কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।