সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা রেমিটেন্স কমছে, সংকুচিত হয়ে আসছে শ্রমবাজার

45

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আনুমানিক ১ কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন। এর মধ্যে ৮০ লাখের মতো আছেন মধ্যপ্রাচ্যে এবং ২০ লাখ অন্যান্য দেশে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ যে পর্যায়ে আছে তাতে নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে নিতে হবে। বাংলাদেশ থেকে ইদানীংকালে অবৈধ পথে তুরস্ক, সিরিয়া যাওয়ার সময় অনেক মানুষ বিপথগামী হচ্ছে ও মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক ধরপাকড় হচ্ছে। দেশটি বিভিন্ন সময়ে তাদের ইচ্ছার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর ট্যাক্স ধার্য করা হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে কার্যকর কোনো এমওইউ না থাকার কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেখানে লোক পাঠানো যাচ্ছে না। কোরিয়ার এলজি কোম্পানি বাংলাদেশে বড় ধরনের একটি ইন্ডাস্ট্রি করবে। ইন্ডাস্ট্রিজে যত লোক লাগবে তাদেরকে এ সমস্ত ট্রেনিং সেন্টারে ট্রেনিং ও ইন্টার্নি করানো হবে এবং পরবর্তীতে এ ইন্ডাস্ট্রিজেই তারা চাকরি করতে পারবে। থাইল্যান্ড অনেক আগে বলেছিলো বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার জেলে পেশার লোক নেবে। পরে সেখান থেকে কোনো চাহিদা আসেনি। জানা গেছে, অন্য দেশ থেকে তারা লোক নিচ্ছে। দুবাইয়ে বাংলাদেশের কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী আছে। সে দেশের লেবার মিনিস্টারের উপদেষ্টা বলেছেন, খুব শিগগিরই বাংলাদেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হবে। সম্প্রতি জাপানের একটি ডিমান্ড পাওয়া গেছে এবং ইতিমধ্যে ১৭ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়েছে। বাহরাইনের বিষয়ে যে রিপোর্ট পাওয়া গেছে এবং রিপোর্টে যে সিদ্ধান্তগুলো দেয়া হয়েছে মন্ত্রণালয় তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তুরস্ক ও সাইপ্রাসের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের নজরদারি রয়েছে এবং মনিটরিং টিম কাজ করছে। গত বছর বাংলাদেশে জিএফএমডি সফলতার সঙ্গে হয়েছিলো। এবারের জিএফএমডি জার্মানিতে হয়েছে। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। যা সরকার তথা দেশের জন্য অপ্রত্যাশিত। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অধিক হারে শ্রমিক যাচ্ছে কিন্তু রেমিটেন্স প্রবাহ ক্রমশ কমছে। এটা দেশের জন্য বিপদ সংকেত। বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির এক আলোচনায় এ চিত্র পাওয়া গেছে। আলোচনায় অংশ নেন কমিটির সদস্য ৬ এমপি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক, বোয়েলস ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সংসদীয় কমিটির ওই আলোচনা পরে কার্যবিবরণীতে প্রকাশ করা হয়।
বৈঠকে আলোচনায় অংশ নিয়ে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক বলেন, ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া কারাগারে ৯ জন, গত বছর ৫ জন এবং চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১ জনসহ মোট ১৫ জন বন্দি মারা গেছেন। মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে তারা কারাগার ও ক্যাম্প পরিদর্শন করছে এবং যারা অসুস্থ আছে তাদেরকে চিকিৎসা দেয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে সেখানে কী কী বিষয়ে কথা হয়েছে, তারা কী ধরনের শ্রমিক নেবে, বেতন কত, চাকরির শর্ত ইত্যাদি জানা থাকলে তা জনগণের মধ্যে প্রচার করা যায়। দুবাইয়ের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। বলেন, দুবাইয়ে শ্রমিক সংকটের কথা শোনা গেলেও বাংলাদেশ থেকে কোনো শ্রমিক দেয়া যাচ্ছে না। মালয়েশিয়ায় তিন বছরে ১৫ লাখ লোক পাঠানোর কথা। কিন্তু যেভাবে মানুষ যাচ্ছে তাতে ৩০ বছরেও ১৫ লাখ লোক যেতে পারবে না। তিনি বলেন, রেমিটেন্স আয়ের কথা বলে এ সেক্টরের মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে তা সকলের দৃশ্যপটের বাইরে রয়ে গেছে। বাহরাইনে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসি থেকে শুরু করে এদেশের আদম ব্যাপারী ও বাহরাইনের শিয়া গোষ্ঠী মিলে সিন্ডিকেট করে ভিসা দেয়া হচ্ছে। যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। সংসদ সদস্য শাহাব উদ্দিন বলেন, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক ধরপাকড় হচ্ছে। পত্রিকায় এসেছে সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর ট্যাক্স ধার্য করা হয়েছে। সংসদ সদস্য মুন্নুজান সুফিয়ান বলেন, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর যে অনিয়ম তা দীর্ঘদিনের। বাহরাইনে ভিসা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর তার অধীনস্থ কর্মকর্তাকে যে বলপ্রয়োগ করছে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। দুবাই ও বাহরাইনের বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। সংসদীয় কমিটির সভাপতি নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, যে দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার জড়িত তাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। বর্তমানে কাতারসহ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। জি-টু-জি পদ্ধতিতে বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে যেভাবে কথা হয় তারা দেশে গিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি রাখেন না। যার ফলে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়। প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী বলেন, ইউরোপ, ইংল্যান্ড, ইউকে এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের জমিজমা তাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনরা নামজারির মাধ্যমে দখল করে নিয়ে যাচ্ছে মর্মে তার কাছে অনেক টেলিফোন আসে। এ বিষয়গুলো দেখাশোনার জন্য আগে সিলেটে ডিআইজির নেতৃত্বে একটি সেল করা হয়েছিলো। বর্তমানে তা অকার্যকর। বিষয়টি নিয়ে কিছু করা যায় কিনা সে অনুরোধ জানান। রেমিটেন্স কমে যাওয়াকে তিনি বাংলাদেশের জন্য বিপদ সংকেত বলে মনে করেন। বৈঠকে বিএমইটি মহাপরিচালক বলেন, সম্প্রতি জাপানের একটি ডিমান্ড পাওয়া গেছে এবং ইতিমধ্যে ১৭ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়েছে। জাপানের প্রতিনিধি এসে মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজ থেকে এদেরকে নিয়েছে এবং তারাই এটি রিক্রুট করেছে। সেখানে ট্রেনিং ইন্টার্নিগণ বিনা খরচে যাবে। এরা চার মাস বাংলাদেশে ট্রেনিং করবে এবং প্রত্যেকের জন্য ৬০ হাজার টাকা করে ট্রেনিং খরচ জাপান কর্তৃপক্ষ বহন করবে। জাপান থেকে একটি টিম এসে মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজ থেকে ৫০০ লোকের ডাটা নিয়ে গেছে এবং সেখান থেকে তারা কতজন লোক নেবে তা শিগগিরই জানা যাবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন যে, সৌদি আরবে ১ লাখ ড্রাইভার প্রয়োজন হবে। এ ড্রাইভারদের পাঠানোর জন্য বিএমইটি ও বিআরটিসির ট্রেনিং সেন্টার থেকে তাদেরকে সৌদি আরবের কারিকুলাম অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। প্রশিক্ষণ প্রদানের পর সৌদি আরবের লোক এসে ড্রাইভারদের পরীক্ষা নেবে এবং উত্তীর্ণ হলে তারা সৌদি আরবের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবে এবং এ লাইসেন্স নিয়ে তারা সে দেশে যেতে পারবে। জিসিসিভুক্ত ৬টি দেশে এ লাইসেন্সের বৈধতা থাকবে। আলোচনায় অংশ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব বলেন, জি-টু-জি’র সময়ে সবকিছু মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। এখন মালয়েশিয়ায় লোক প্রেরণ ব্যবসার মধ্যে জড়িত হয়েছে। অনেক কিছু মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাই ৩৫ হাজার টাকায় মালয়েশিয়ায় লোক যেতে পারছে না। কিন্তু পুরো এমওইউ মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ায় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কিছু বলাও যাচ্ছে না। তাই এ ব্যবস্থাপনা থাকবে কিনা সে বিষয়ে স্থায়ী কমিটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে তিনি মনে করেন। বৈঠকে সচিব জানান, মালয়েশিয়ায় ধরপাকড়ের বিষয়ে নতুন করে রি-হিয়ারিং কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রায় ২ লাখ ৫৮ হাজার শ্রমিক রি-হিয়ারিং প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যাদের কোনো ডকুমেন্টস নেই তারা যাতে এনফোর্সমেন্ট কার্ড নিয়ে বৈধ হতে পারে সে জন্য প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ জানিয়েছেন। এ ধরপাকড়ের নামে সেখানে বৈধ লোকজন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার অ্যাম্বাসেডরকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে। এদিকে আলোচনায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী জানান, রেমিটেন্স কমার প্রধান কারণ হলো হুন্ডি। হুন্ডির মাধ্যমে পাঠালে টাকা বেশি পাওয়া যায়। বৈধ চ্যানেলে ও হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর মধ্যে যে গ্যাপ রয়েছে তা কমিয়ে আনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে ইনসেনটিভের ব্যবস্থা করার জন্য বলা হয়েছে। তিনি জানান, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৬৮৫ জন কর্মী বিদেশ গেছে। বিগত দুই বছরে যত কর্মী বিদেশ গেছে একমাত্র অসুস্থতা ছাড়া কোনো কর্মীই দেশে ফেরত আসেনি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের উচ্ছেদ করার জন্য ভারতই বেশি করে বাংলাদেশি কর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য তিনি সকলকে অনুরোধ জানান।

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা