সামনে বাধা তবুও ছুটতে চান আরিফ

22

দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর চলার পথ। খাতাপত্রের হিসেবে ৪ বছরের বেশি সময় কাটলেও অর্ধেকেরই বেশি সময় কেটেছে নগর ভবন থেকে দূরে। পদহীন অথবা কারাবন্দি অবস্থায়। ঝুলে থাকা মামলাগুলো থেকে জামিন ও মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তির পর নতুন করে চেয়ারে বসার পরও খুব একটা স্বস্তিতে নেই মেয়র আরিফ। বারেবারেই প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাকে। সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নগরবাসীকে দেয়া তার প্রতিশ্রুতিগুলোও।
নতুন করে দায়িত্ব নেয়ার পর আরিফুল হক মনোযোগী হন তার অবর্তমানে থেমে যাওয়া কাজগুলোকে এগিয়ে নিতে। ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদ, রাস্তা প্রশস্তকরণ, জলাবদ্ধতা নিরসনে ছড়া খাল উদ্ধারের কাজগুলোতে গতি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন। ফুটপাথকে হকারমুক্ত করার কাজটি নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারলেও বাধা আসে রাস্তা প্রশস্তকরণের কাজে। মিরবক্সটুলায় রাস্তা প্রশস্তকরণ করতে গিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে হয় মেয়রকে। নিজেদের সীমানা ভেঙে রাস্তার জন্য ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি স্থানীয় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। গত ১৭ই জুলাই এ নিয়ে বাদানুবাদ হয় মেয়রের উপস্থিতিতে সিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কলেজ কর্তৃপক্ষের। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এর এক সপ্তাহ পর সিলেট এম এ জি ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একাত্তরের সংগ্রামী নারী কাকন বিবির পাশে দাঁড়াতে গেলেও বাধার মুখে পড়েন সিটি মেয়র। ২৪শে জুলাই বীরাঙ্গনা কাকন বিবির কেবিনের জন্য একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র পাঠালেও তা ফেরত পাঠিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আরিফুল হক মনে করছেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারাতেই হয়তো তার পথে বাধা আসছে।
আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১৩ সালের ১৫ই জুন। দায়িত্বগ্রহণের দেড় বছরের মাথায় থমকে যায় মেয়র আরিফের চলার গতি। ২০১৪ সালের শেষ দিকে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার সম্পূরক চার্জশিটে অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ওই বছরের ৩০শে ডিসেম্বর হবিগঞ্জের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন আরিফুল। যেতে হয় কারাগারে, হারাতে হয় মেয়র পদও। মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার কারণে ২০১৫ সালের ৭ই জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। কারাগারে থাকা অবস্থায়ই আরিফুল হক অভিযুক্ত হন ১২ বছর আগে সংঘটিত প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় বোমা হামলা সংশ্লিষ্ট মামলায়ও। মামলাগুলো মাথায় নিয়েই দু’বছর কারাগারে কাটাতে হয় আরিফুল হককে। উচ্চ আদালত থেকে সবক’টি মামলায় জামিন লাভের পরই চলতি বছরের ৪ঠা জানুয়ারি মুক্তির দুয়ার খুলে আরিফের জন্য। মুক্তি পাওয়ার পর বরখাস্তের সাময়িক আদেশ চ্যালেঞ্জ করলে হাইকোর্ট গত ১৩ই মার্চ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আদেশটি ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে দেন। রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের পর স্থগিতাদেশটি টিকে যাওয়ায় ৩০শে মার্চ নগরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আরিফুল হক। তবে সে দায়িত্বকালের মেয়াদ ছিল মাত্র তিন ঘণ্টা। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে আবার বরখাস্তের চিঠি আসে আরিফুল হকের নামে। আবার পদ হারান, আবার আইনি লড়াইয়ে নামেন আরিফ। আইনি লড়াই শেষে ৪ঠা মে আবার দায়িত্ব বুঝে নেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
কারাগার থেকে বেরিয়ে নতুন করে দায়িত্ব নেয়ার পরও সকলের মন জয় করে নিতে পারেননি আরিফুল। তবে বেশ দৃঢ়কণ্ঠেই আরিফুল হক মানবজমিনকে বললেন যত বাধাই আসুক সাধ্যমতো নগরের উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাবেন তিনি। খোলামেলাভাবে নগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনার অনেক কিছু তিনি স্পষ্ট করেছেন মানবজমিনের কাছে। সবচেয়ে আলোচিত সমস্যা নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে মেয়র আরিফের বক্তব্য হচ্ছে, মাঝে থমকে না গেলে এতদিনে নগরীর জলাবদ্ধতার একটা সমাধান হয়েই যেত। তিনি তথ্য দেন, অনেক ছড়া খালই চলার পথে দখল হয়ে যাওয়ায় পানি মাঝপথেই আটকে থাকে। আরিফ বললেন, ছড়া-খালের গতিপথ মুক্ত করতে না পারলে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। জানালেন, তিনি এ পথেই হাঁটছেন। উদাহরণ হিসেবে সিলেটের মেয়র আরিফ হলদিছড়ার নাম উল্লেখ করেন। জানালেন, দেড় কিলোমিটার এলাকা অধিগ্রহণ করে হলদিছড়ার গতিপথ মুক্ত করার কাজ চলছে। আরিফ বললেন, নির্বাচনের আগে হাতে সময় কম। এই সময়ের মধ্যে সকল ছড়া-খাল উদ্ধার করা সম্ভব নয়। একসাথে সকল ছড়া উদ্ধারের কাজে হাত দিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি হোক তা চান না তিনি। তার ভাষ্য, সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে ছুটতে চান না। যেটুকু সম্ভব সেটুকুতেই হাত দেবেন। যে কাজে হাত দেবেন সেটা অন্তত শেষ করতে চান তিনি।
সিলেটের নগরপিতা আরিফুল হক চৌধুরী তথ্য দেন, নগরীর উন্নয়ন কাজে ব্যবহারের জন্য ইতিমধ্যেই বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও যানবাহন তাদের সংগ্রহে থাকলেও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে নগরবাসী এর সুফল পাচ্ছেন না। আরিফুল হক জানান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তত্ত্বাবধানে যাচাইয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
আরিফুল হক চৌধুরী গতি আনতে চান নগর ভবনের কাজকর্মেও। কাজের সুবিধার্থে পুরো নগরীকে ৩টি জোনে ভাগ করতে চান তিনি। একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে একেকটি জোনের সকল উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে বলে জানান মেয়র। আর সেবাগুলোকে নিয়ে আসতে চান অনলাইনের আওতায়, যাতে নগরবাসীকে ছোট ছোট বিষয়ের জন্য নগরভবনে ছুটতে না হয়। প্রবাসীরা দেশের বাইরে থেকেই অনলাইনে বাড়ির নকশা অনুমোদন, হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করতে পারবেন।
সিলেটের আলোচিত ট্রাক টার্মিনালের একটি সুরাহা হচ্ছে বলে জানান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। পরিবহন সংস্থাগুলোর জন্যও সেখানেই ব্যবস্থা করা হবে যাতে নগরীর পথে আর ট্রাকের আনাগোনা না থাকে। আরিফুল জানান, রাস্তার উপর থাকা বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সেবার যে লাইনগুলো চলে গেছে তা ভূগর্ভস্থ করার যে প্রকল্পটি তিনি কারাগারে যাওয়ার পর থমকে গিয়েছিল তা আবারও শুরু হচ্ছে। এবার এ প্রকল্পের ক্ষেত্র আরো বেড়েছে বলে জানান তিনি। এর ফলে রাস্তা প্রশস্ত না করেও এর বেশি ব্যবহার করা যাবে।
মানবজমিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় আরো ছোটখাটো অনেক পরিকল্পনার কথা জানালেন আরিফুল হক চৌধুরী। নগরবাসীর সমস্যা-অভিযোগগুলো জানতে জরিপ চালানোর কথাও বলেন তিনি। জানালেন, সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের লেখাপড়ার জন্য করপোরেশন থেকে বিনা পয়সায় শিক্ষক দেবেন বলে জানালেন আরিফ। ছোট-ছোট স্বপ্নগুলোকে জুড়ে দিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত নগরীরই স্বপ্ন দেখছেন আরিফুল হক চৌধুরী।