সৃজনশীল নিয়ে মন্ত্রণালয়ের অসন্তোষ

45

আট বছরের মাথায় বিতর্কের মুখে পড়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পর সেই বিতর্কে এবার যোগ দিয়েছে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ পদ্ধতিকে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বললেও শ্রেণিকক্ষে এ পদ্ধতিতে পাঠদান ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মন্ত্রণালয়। শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতি ব্যবহারে যথেষ্ট দক্ষতা দেখাতে না পারায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বাজারের প্রচলিত গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এছাড়া সম্প্রতি মাউশি’র এক প্রতিবেদনে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক সৃজনশীল বুঝে না বলে বলা হয়েছে। সৃজনশীলের এই দৈন্যদশা থেকে উত্তরণে বেশ কিছু উদ্যোগ হাতে নিলেও কাজে আসছে না। সর্বশেষ অক্টোবর মাসে এই পদ্ধতির নেতিবাচক দিক কাটিয়ে উঠার জন্য শিক্ষাবিদরা পরামর্শ নিয়েছিলেন। সেখানে এমসিকিউ উঠিয়ে দেয়ার দাবি উঠে। সম্প্রতি একই দাবি করেছেন শিক্ষাসচিব সোহরাব হোসাইন। বিতর্কের মুখে সৃজনশীল পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানোর জন্য শিক্ষকদের আবার প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেই প্রশিক্ষণের নাম দেয়া হয়েছে ‘রিফফ্রেশার কোর্স’ উজ্জীবনমূলক প্রশিক্ষণ। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সায় মিলেছে। সংশ্লিষ্ট সৃজনশীল পদ্ধতির পুরো প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। দাতা সংস্থার অর্থায়নে যে প্রশিক্ষণ হয়, তা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তা মূল্যায়ন রিপোর্ট করা থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষে এর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিতর্ক ঠেকাতে গত এক বছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাবিদদের নিয়ে বেশক’টি সভাও করেছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। ফলে পড়াশোনা হয়ে গেছে কোচিং আর গাইডনির্ভর।
এ ব্যাপারে শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, এ পদ্ধতি চালু করার সময় থেকে প্রশ্ন উঠেছে। যারা এটার বাস্তবায়ন করবে তাদেরই এ পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান নেই। তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে। উজ্জীবনমূলক প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যাপারে তিনি বলেন, যিনি প্রথমবার তিনদিনের প্রশিক্ষণে এটা বুঝেননি তিনি একদিনের প্রশিক্ষণে বুঝে যাবেন- এর কী নিশ্চয়তা আছে। এটা সরকারের টাকা খরচের একটা উপলক্ষ বলেও মত দেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসে দ্বিতীয় পাক্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেখানে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের এক প্রতিবেদনে সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতির প্রচলন একটি ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ পদ্ধতি। এ পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নে তারা এর ব্যবহারে যথেষ্ট দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারছে না। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বাজারে প্রচলিত গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সৃজনশীল পদ্ধতির ওপর দীর্ঘদিন পূর্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে পর্যায়ক্রমে ‘রিফফ্রেশার কোর্স’ উজ্জীবনমূলক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। এই প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেছে। এই সিদ্ধান্ত দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, মাদরাসা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে অর্ধেকের বেশি (৫২.০৫%) মাধ্যমিক শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝেনই না। গত মে মাসে ১৮ হাজার ৫৯৮টি মাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শন করে মাউশি এ প্রতিবেদন দেয়। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে এ ধরনের প্রতিবেদন দিয়েছে। যার সবগুলোকে সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষজনক প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে এতো ঢাকঢোল পিটিয়ে যে সৃজনশীল প্রশ্নপত্র চালু করা হলো, লাখ লাখ মাধ্যমিক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হলো, তারপরও অর্ধেকের বেশি শিক্ষক সৃজনশীল অংশ বোঝেন না কেন- এ নিয়ে শিক্ষাবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন।
এ ব্যাপারে কারিগরি ও মাদরাসা সচিব মো. আলমগীর মানবজমিনকে বলেন, প্রশিক্ষণের ফলে সৃজনশীলের অবস্থা অনেকটা উন্নতি হয়েছে। তবে আশানুরূপ নয়। শিক্ষকরা না বুঝেই গাইডনির্ভর পড়াশুনা করাচ্ছে। এ জন্য আমরা উজ্জীবনমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। যেকোনো প্রশিক্ষণে উজ্জীবনমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। তারই অংশ হিসেবে এটা করা হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষকই যদি না বোঝেন, তাহলে তারা কী পড়ান? শিক্ষকরা পাঠদান থেকে শুরু করে প্রশ্নের বিষয় নির্ধারণ ও প্রশ্ন প্রণয়ন সর্বত্রই অদক্ষ এবং কারসাজির পরিচয় দিচ্ছেন। যা খুশি তা দিয়েই চলছে প্রশ্ন প্রণয়ন। স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা ছাড়াও জেএসসি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষায় এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা