সৌদি আরবে চামেলির দুঃসহ ২২ দিন

38

চামেলি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। ছোট বোনটার বয়স বছরও পেরোয়নি। এই অবস্থায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবাকে হারায় তারা। মা তাদের নিয়ে যান নানার সংসারে। সেখান থেকেই এসএসসি পাস করেন চামেলি। এরপর এইচএসসি পরীক্ষার আগে চলে আসেন ঢাকায়। চাকরি নেন একটি গার্মেন্ট কারখানায়। সংসারের হাল ধরেন তিনি। সম্প্রতি তার বেতন দাঁড়িয়েছিল ১০-১২ হাজার টাকা। এই অবস্থায় গত ৭ মাস আগে মা-বোনকে মামাদের কাছ থেকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে। ছোট বোনকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। চামেলির একার আয়ে কোনরকম চলে যাচ্ছিল তাদের সংসার। এরই মধ্যে পরিচয় হয় এক ভাবির সঙ্গে। তিনি প্রায়ই সৌদি যাতায়াত করতেন। সেই ভাবিই তাকে পরামর্শ দেন সৌদি আরবে যাওয়ার। প্রলোভন দেখান মোটা বেতনের চাকরির। জীবনকে আরেকটু সুন্দরভাবে গোছাতে তাই সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভাবি তাকে যোগাযোগ করিয়ে দেন দালাল যশোরের বাসিন্দা করিম ও রাজধানীর কচুক্ষেতের হালিম নামে দুই ব্যক্তির সঙ্গে। বনানীতে অফিস তাদের। তারাই সৌদি পাঠানোর যাবতীয় বন্দোবস্ত করে। কিন্তু সৌদি গিয়েই বুঝতে পারেন প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন তিনি। তারা তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করছে। দিনের পর দিন না খাইয়ে রেখেছে। মারধর করেছে। বন্দি করে রেখেছে। একের পর এক হাত বদল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মুক্তি মিলেছে। নিজের বুদ্ধিমত্তা আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সহাযোগিতায় দেশে ফিরেছেন তিনি। তবে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন ২২ দিনের দুঃসহ স্মৃতি। এদিকে সে দেশের একই ভাগ্যবরণ করা একাধিক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় চামেলির। এদের মধ্যে রুনা ও শিরিন নামে দুই বাংলাদেশি মেয়ে তার সঙ্গেই ছিল। কিন্তু হাতবদল ও নির্যাতনের একপর্যায়ে গুম হয়ে গেছেন শিরিন। আজও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে এই অভিযোগের মধ্যেই হালিম ও করিম তাদের এজেন্সির মাধ্যমে আজ আরো ৭ নারীকে সৌদি পাঠাচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
চামেলির আশঙ্কা তারাও তার মতো পাচারের শিকার হতে যাচ্ছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সহযোগিতায় গত শুক্রবার রাত ২টায় দেশে ফেরেন চামেলি। গতকাল আসক অফিসে যান তিনি। সেখানে কথা হয় চামেলির সঙ্গে। সৌদি আরবে কাটানো ২২দিনের ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ১৭ই জুলাই তিনি দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের একটি ফ্লাইটে রওনা দিয়ে ওইদিন রাত ১২টার দিকে তিনি সৌদির দাম্মাম পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে দু’জন ব্যক্তি তাকে সংশ্লিষ্ট অফিসে নিয়ে যায়। পরে ওই রাতেই ১টার দিকে তাকে কাজের জন্য সৌদি এক মালিক এসে তাকে নিয়ে যায়। পরে রাত ২টার দিকে মালিক তার ঘরে ঢুকে শরীরে হাত দেয়। এ সময় তিনি তাকে ধাক্কা দিয়ে বাথরুমে লুকান। ওই রাত ওভাবেই কাটে। পরদিন সকালে মালিকের বউ তাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বাইরে চলে যান। ওই সময় তাকে রাতের ঘটনা বুঝানোর চেষ্টা করেও কোনো পাত্তা পাননি। পরে দুপুরের দিকে মালিক তার রুমে যান। এ সময় তিনি আবারো বাথরুমে গিয়ে লুকান। সারাদিন কোনো খাবার দেয়নি। পরে তিনি কাজ-কর্ম বাদ দিয়ে বিকাল ৫টার দিকে মক্তবের (অফিস) সুপারভাইজার শ্রীলঙ্কান নাগরিক সুলতানের কাছে নিয়ে যান। তিনি তার কাছে ঘটনা খুলে বলেন। অফিসে গিয়ে দালাল হালিমকেও ফোন দিয়ে সৌদি থাকবেন না বলে জানান চামেলি। এ সময় বনানীর এজেন্সির মালিক তাকে গালিগালাজ করে। পরে ২১শে জুলাই ওই অফিসের ম্যানেজারের এক সৌদি নাগরিকের বোনের বান্ধবীর বাসায় কাজে দেয়। তিনি গিয়ে দেখেন ওই বাসায় আরো দুই বাংলাদেশী নারী ছিল। শিরিন ও রুনা নামের ওই দুইজন জানান, তারাও তার মতো প্রতারণার শিকার হয়েছে। তাদেরকে দুই লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে জানিয়ে বলে দুই বছরের আগে তারা বের হতে পারবে না। শিরিন জানায় সে ৭ মাস কাজ করেও কোনো বেতন পায়নি। অন্যদিকে রুনা ৪ মাস কাজ করে এক মাসের বেতন পেয়েছে। সেখানে তাদের খেতে দেয়া হয় না। সব সময় রুমের ভেতরে আটক করে রাখে। এ অবস্থায় চামেলি কৌশলে মোবাইলে ইন্টারনেট চালু করে দেশে তার এক খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুর্দশার কথা জানান। সেই ভাই তাকে ঝিনাইদহের একটি মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি ওই অফিসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দেন। এদিকে ওই বাসায় এভাবেই কাটে বেশ কয়েকদিন। পরে অফিসের ওই ম্যানেজারে মায়ের বাসায় কাজ করতে দেয় তাদের তিনজনের। সেখানে আরো ৭ জন মেয়ে ছিল যাদের মধ্যে ৩ জন বাংলাদেশি। সেখানে একটি ঘরে আটকে রেখে তাদের কোন খাবার দেয়া হয়নি। পানি দেয়া হয়নি। শুধু বাথরুম করার জন্য ঘরের দরজা খুলে দেয়া হতো। এভাবে তিনদিন কাটার পর তিনি খাবারের কথা বললে তাকে মারধর করে। এতে তিনি চিৎকার করলে মুখ বেঁধে তাকে ফেলে রাখে। পরে শ্রীলঙ্কান এক নারী তার ছবি তুলে। ওই ছবি তিনি দেশে তার ভাই ও অন্যদের কাছে পাঠিয়ে দেন। দালাল হালিমও এ ঘটনা জানতে পারে। পরে চামেলি, রুনা ও শিরিনকে অফিসে ফেরত আনা হয়। বলা হয়, তাদেরকে দেশে পাঠানো হবে। কিন্তু পাসপোর্ট পাওয়া জায়নি দাবি করে অফিসের লোকজন তাদের তিনজনকে শান নামে সৌদি আরেক দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। শান তাদেরকে একটি গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই গাড়িতে তার এক বন্ধু ছিলে। সে রুনাকে পছন্দ হয়েছে জানিয়ে তাকে একটি হোটেলে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু রুনা রাজি না হওয়ায় একটি ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে তাকে মারধর করে। তাকে বিবস্ত্র করে মারধর করতে থাকে। চামেলি বলেন, একবার মাগো বলে রুনার চিৎকার শুনেছিলাম। পরে আর শুনিনি। এদিকে শানের সঙ্গে যেতে না চাওয়ায় তাদেরকে একটি পুলিশের কোর্য়াটারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশকে তারা রুনার কথা জানালে পুলিশ তাদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু তারা অস্বীকার করে বলে যে তারা দু’জনকেই এনেছে। এদিকে চামেলির হাত-মুখ বাঁধা ছবি মক্তবেও পৌঁছে যায়। এ কথা জানার পর শান তার কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়। এরপর তাদের আবারো মক্তবে নিয়ে যাওয়া হয়। হালিম ফোন করে চামেলিকে বলে সে যদি লিখিত স্টেটমেন্ট দেয় যে, তাকে নির্যাতন করা হয়নি তাহলে দেশে ফেরত আনা হবে। চামেলি অস্বীকৃতি জানালে, সুলতান তার পায়ের তলায় কাঠের লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। তাকে আবারো শানের কাছে পাঠিয়ে দিতে চায়। পরে সহ্য করতে না পেরে তিনি স্টেটমেন্ট দিতে বাধ্য হন। স্টেটমেন্টে বলেন, তিনি সৌদিতে ভালো আছেন। দু’দিন দেশে পাঠানোর জন্য সময় নিয়েছে। এদিকে হালিম গাজিপুরে থাকা তার মাকেও একই স্টেটমেন্ট দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। এর দু’দিন পর গত শুক্রবার চামেলি ও শিরিনকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে এখনো কোন খোঁজ মেলেনি রুনার। এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির জানান, তারা ঝিনাইদহের আবদুর রহমান নামের এক মানবাধিকার কর্মীর মাধ্যমে এই ঘটনা জানার পর থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন। অভিযোগ পেয়ে দূতাবাসও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে। এদিকে মানবজমিনকে হালিম জানান, তিনি বিটিএস নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেন। তার অফিস বনানী নয়, কাকরাইল। তবে তিনি চামেলিকে সৌদি পাঠানোর কথা স্বীকার করে বলেন, তাকে যে বাসায় দেয়া হয়েছিল প্রথম সে বাসায় সমস্যা হয়েছিল। পরে তাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতনের কথা সরাসরি অস্বীকার না করে তিনি বলেন, কাজ না পারায় তাকে মারধর করতে পারে। তাকে বিদেশ পাঠানোর আগে কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে হালিম জানান, কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। ওখানে কাজ করতে করতে অনেকে শিখে যায় বলেও জানান তিনি।