সৌদি বাদশাহর রাশিয়া সফর দু’দেশের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ও সমরাস্ত্র চুক্তি

33

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব। রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে দেশটি। বৃহস্পতিবার রাশিয়া সফররত সৌদি বাদশাহ সালমান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এ সময় বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দর পতন ঠেকাতে উভয় দেশের মধ্যে জ্বালানি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ দুইটি তেল উত্তোলন সীমিত করতে ‘ওপেক’ চুক্তি বর্ধিত করার ব্যাপারে একমত হয়েছে। চুক্তির ব্যাপারে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও কয়েকটি রকেট উৎক্ষেপক কেনার জন্য সৌদি আরব প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া দুই দেশ কয়েক বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অনেকগুলো বিনিয়োগ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ক্রেমলিন হলে বাদশাহ সালমানকে স্বাগত জানিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, ‘আমাদের সম্পর্কের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সৌদি বাদশাহ রাশিয়া সফরে আসলো। এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আমি নিশ্চিত যে, আপনার সফর আমাদের মধ্যকার বন্ধনকে আরো শক্তিশালী করবে।’  তিনি বলেন, ‘শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য, বিশ্ব অর্থনীতির উন্নতির জন্য, আমরা আমাদের সম্পর্ককে আরো মজবুত করবো।’ সফরের ব্যাপারে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়ের বলেন, রাশিয়া ও সৌদি আরবের সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক সময়ে পৌঁছেছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ চুক্তির ব্যাপারে বলেন, জ্বালানি, মহাকাশ অনুসন্ধান, কৃষিশিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বহুমুখী ঝুঁকি
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বাজারের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। চলতি বছরের মে মাসে রিয়াদ ওয়াশিংটন থেকে ১১০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অস্ত্র কেনার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। সিরিয়া সংঘাতের ক্ষেত্রে রাশিয়া সৌদি আরবের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। আর বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য তেল উত্তোলন কমানোর ক্ষেত্রে রাশিয়া সৌদি আরবের সহযোগী। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, দুই দেশের সম্পর্ক শক্তিশালী হলে তা বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে ক্রেমলিনের ‘কাউন্সিল অন ফরেন এন্ড ডিফেন্স পলিসির’ চেয়ারম্যান ফিওডর লুকানভ এএফপিকে বলেছেন, মস্কোর সঙ্গে বন্ধনকে রিয়াদ সাময়িক সুবিধার জন্য ব্যবহার করছে। দেশটি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশ থেকেই অস্ত্র কিনে নানাবিধ ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। সৌদি আরব রাশিয়াকে এমন একটি অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গ্রহণ করেছে যা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা এখন রাশিয়াকে আরো বেশি সম্মান করে। কিন্তু চিরদিনই এমন সম্মান করবে এটা চিন্তা করা ঠিক না।
স্থিতিশীলতার জন্য তেল উত্তোলন সীমিতকরণ
সৌদি বাদশাহর রাশিয়া সফরের সময় তেল উত্তোলন কমাতে ওপেক চুক্তি বর্ধিত করার ব্যাপারে আলোচনা করেন দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। রাশিয়া, অন্য তেল উত্তোলনকারী দেশ ও ওপেক এর সদস্য দেশগুলো বিশ্ব বাজারে দাম বাড়ানোর জন্য তেলের উত্তোলন কমাতে চুক্তিবদ্ধ  হয়েছিল। সৌদি বাদশাহ সালমান বলেছেন, বিশ্ব বাজারে তেলের দামে স্থিতিশীলতা আনার জন্য আমরা দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক সহযোগিতা চালু রাখার চেষ্টা করছি। রাশিয়া ও সৌদি আরব তেল রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০১৪ সালে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করলে দু’দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে। পরিস্থিতির উন্নয়নে তেল উত্তোলন কমিয়ে দেয় উত্তোলনকারী দেশগুলো। উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে ‘ওপেকভুক্ত’ (প্রধান তেল উত্তোলনকারী দেশগুলোর সংগঠন) দেশগুলো একটি চুক্তি সম্পাদন করে। ওপেক এর বাইরে থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তেল উত্তোলন কমানোর ব্যাপারে সম্মতি দেয় রাশিয়া। বুধবার পুতিন বলেছেন, তেল উত্তোলন কমানোর ব্যাপারে ওপেকের চুক্তি কমপক্ষে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা সম্ভব।
সিরিয়া ও ইয়েমেন
তেলের বাজারে রাশিয়া ও সৌদি আরব অংশীদার হলেও সিরিয়া ইস্যুতে তারা একে অপরের বিপরীত অবস্থানে। মস্কো প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন করলেও রিয়াদ বাশার-বিরোধীদের সমর্থন দিয়ে আসছে। সৌদি বাদশাহর সৌদি সফরে এই ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ বলেন, সৌদি বাদশা ও পুতিনের বৈঠকে সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া ও ইয়েমেনের বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে জাতিসংঘের উদ্যোগে শান্তি আলোচনায় সিরিয়ার বিদ্রোহী বাহিনীর অংশগ্রহণের ব্যাপারে উভয় দেশ একমত।

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা