স্মরণে নায়করাজ ‘শিকারে যাওয়ার বেশ নেশা ছিল রাজ্জাকের’

38

আবদুল লতিফ বাচ্চু। বাংলা চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান চিত্রগ্রাহক। শুধু চিত্রগ্রহণ নয়, বেশকিছু সিনেমা পরিচালনাও করেছেন তিনি। বর্তমানে চলচ্চিত্র গ্রাহক সংস্থার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২১শে আগস্ট বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। নায়করাজের সঙ্গে চিত্রগ্রাহক হিসেবে ২২টি ছবিতে কাজ করেছেন আবদুল লতিফ বাচ্চু। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল বেশ চমৎকার সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের আলোকেই নায়করাজ রাজ্জাককে নিয়ে নানা স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। সেসব নিয়ে আজ প্রকাশ হচ্ছে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের শেষ কিস্তি। এটি অনুলিখন করেছেন কামরুজ্জামান মিলু
রাজ্জাক শুটিংয়ে অনেক ব্যস্ত থাকলেও অবসরে আড্ডা দিতে, মাছ ধরতে ও আউটডোরে গিয়ে শিকার করতে পছন্দ করত। আর সে শিকারে গেলে একা কখনও জঙ্গলে যেত না। আমি শুটিংয়ে থাকলে আমাকে অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যেত। একবার আমাকে, আমার সহযোগী চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান খানকে নিয়ে শিকারে বেরিয়ে গেল। তখন আমরা সিলেটে ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ ছবির শুটিং করছি। রাজ্জাক এই শুটিংয়ে গিয়ে কার কাছে শুনেছে এখানে হরিণ পাওয়া যায়। এটা শুনে আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। কিছুদূর যাওয়ার পর জঙ্গল পেলাম, আমাদের সঙ্গে আরেকটি লোক রেখেছিল রাজ্জাক। তার হাতেও বন্দুক ছিল। আর রাজ্জাকের হাতে ছিল একটা পিস্তল। রাজ্জাক কিছুদূর যাওয়ার পর আমার হাতে একটা ছোট চাকু দিয়ে বললো বাচ্চু ভাই আপনি চাকুটা রাখুন। আমি বললাম, আমি এই জঙ্গলের ভেতরে ছোট চাকু দিয়ে কী করব? অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর কোনো শিকার পেলাম না আমরা। এরপর সন্ধ্যার দিকে আবারো যেতে চাইলো রাজ্জাক। কারণ শিকার করা তার একটা নেশা ছিল, আর সাথী ছিলাম আমরা। যে কথা সেই কাজ। সন্ধ্যার দিকে আবার রওনা করলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা গাছের ডালের উপর বুনো মুরগি নড়াচড়া করছিল। তা দেখে সেটার পিছে দৌড় শুরু করল রাজ্জাক ও মাহফুজুর রহমান খান। আর আমার কাছে একটা পিস্তল দিয়ে গেল। আমি তো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। ভয়ও লাগছে আমার। কারণ যে জায়গা দিয়ে রাজ্জাক গেছে সেখানে সাপ যাওয়ার চিহ্ন দেখতে পেলাম। এরপর পিস্তলটা চেক করতে গিয়ে দেখি এর ভেতর একটা গুলিও নেই। আমিতো ভয়ে চিৎকার করা শুরু করলাম। ডাকতে থাকলাম রাজ্জাক, রাজ্জাক। কিছুক্ষণ পর রাজ্জাক এসে বললো বাচ্চু ভাই পিস্তলের গুলিতো আমার কাছে। আমি তো যাওয়ার সময় আপনাকে গুলিটা দিতে ভুলে গেছি। তারপর সেদিনও কোনো কিছু পেল না রাজ্জাক। এরপর কাপ্তাইয়ে চিত্রনায়িকা কবরীর নিজস্ব একটা প্রোডাকশনে আসলাম। সেখানে হিরো আলমগীরও ছিল। সেখানে এক লোকের রাইফেল আছে জেনে রাজ্জাক কিনবে আগে থেকে ঠিক করল। এরপর সেখানে গিয়ে রাজ্জাক সেই রাইফেল কিনে ফেললো। ৬টা গুলিও দিল রাইফেলের মালিক। এরপর যথারীতি বিকেলে আমরা হরিণ শিকারের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম। এবার শিকারে আমি, রাজ্জাক ও হিরো আলমগীর একসঙ্গে গেলাম। এরপর যেতে যেতে নতুন রাইফেল কেনার পর আমি একবার টেস্ট করার জন্য টুস করে গুলি মারি, অন্যদিকে রাজ্জাক একবার মারে। এভাবে মারতে মারতে আমরা গুলি শেষ করে ফেললাম। এরমধ্যে একজন এসে বললো ভাই এখানে একটা মাজার আছে, দয়া করে শিকার করবেন না। এরপর আমরা সবাই গিয়ে সেই মাজার জিয়ারত করলাম। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মাজার জিয়ারত শেষে দেখলাম তিনটা হরিণ আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তখন তো আমাদের বন্দুকে গুলি নেই। হরিণগুলো আমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন মনে হচ্ছিল তারাও আমাদের উপহাস করছে আর বলছে ‘তোদের বন্দুকে তো গুলি নেই, আমাদের মারবি কিভাবে’। রাজ্জাককে তখন আমি বললাম, দেখলে এবারই প্রথম কোনো হরিণ সামনে আসলো আর আমরা মারতে পারলাম না। এরপর হরিণগুলো চলে যাওয়ার পর আমরা মনের দুঃখে হাঁটা শুরু করলাম। এরপর হঠাৎ গুলির আওয়াজ। মনে হলো অন্য কেউ হরিণ শিকার করেছে। এরপর দেখলাম একটা পালোয়ান হরিণ নিয়ে আসছে। এরপরতো হরিণের সেই মাংস নিলাম আমরা। শুটিং স্পটে রান্না হলো, রীতিমতো একটা উৎসব হলো। সেসময় সেখানে গায়ক ফেরদৌস ওয়াহিদ তার টিমসহ গান করতে গিয়েছিল। তাদের নিমন্ত্রণ করা হলো, একসঙ্গে বসে খাওয়া দাওয়া হলো। খাওয়া শেষে ঢাকায়ও আনা হলো সেই হরিণের মাংস। শিকারে যাওয়ার বেশ নেশা ছিল রাজ্জাকের। এই হচ্ছে তার সৌখিন জীবনের একটা দিক। আজ একটা কথা বারবার মনে হচ্ছে। মানুষ যখন জন্মায় তখন কান্না করে এবং ওই কান্না শুনে সবাই হাসে। বাচ্চার কান্না শুনে আনন্দে বলে ওঠে বাচ্চা হয়েছে…বাচ্চা হয়েছে। তাই কবি কালিদাস তার এক লেখায় বলেছেন, তুমি জীবনে এমন কিছু করো যেন তুমি যেদিন চলে যাবে তুমি হাসবে কিন্তু কাঁদবে সবাই। আজ রাজ্জাক চলে গেছে আর এখন আমরা কাঁদছি।