হঠাৎই সব এলোমেলো

40

শনিবার শেষবারের মতো বাবার সঙ্গে কথা বলেছিল ইলমুন। বাবার কাছে আঙ্গুরসহ নানা ফল খাবার বায়না ধরেছিল। কিন্তু রোববারই সে জানতে পারে তার বাবা আর ফিরে আসবে না।
আফ্রিকার দেশ মালিতে শান্তি রক্ষার কাজে নিয়োজিত শান্তিরক্ষী বাহিনীর তিন বাংলাদেশি সৈন্য রোববার নিহত হন। এর মধ্যে নিহত মনোয়ার হোসেনের বাড়ি বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহনে। তিনি সন্ত্রাসীদের পুঁতে রাখা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। মনোয়ারের বয়স মাত্র ৩০ বছর। স্ত্রী ও দুটি নাবালক সন্তান রয়েছে তার। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অকাল মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েছে তার দুই নাবালক মেয়েসহ স্ত্রী এবং বৃদ্ধা মা। কোনো সান্ত্বনা তাদের আশ্বস্ত করতে পারছেনা। এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে মনোয়ারের লাশটি ফেরত পাওয়া এবং তার বিধবা স্ত্রী, দুই এতিম সন্তান এবং সন্তানহারা মায়ের দায়িত্ব সরকারকে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নিকটাত্মীয়রা। সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামের দুই ছেলে এবং এক মেয়ের মধ্যে সবার বড় মনোয়ার হোসেন। ২০০৩ সালে সেনাবাহিনীর সৈনিক পদে চাকরি নেন তিনি। ২০০৮ সালে একই এলাকার মো. কবির হাওলাদারের মেয়ে ইভা আক্তারকে বিয়ে করেন। তাদের দুই মেয়ে নুসরাত জাহান ইলমুন (৭) এবং তাসমিন (দেড় বছর)। ১০ বছর আগে নগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের চহুতপুর এলাকায় একখণ্ড জমি কিনে টিনের ঘর তৈরি করে সেখানে পরিবার-পরিজন রেখে যশোর ক্যান্টনমেন্টে সৈনিকের চাকরি করছিলেন মনোয়ার। বাবা না থাকায় বৃদ্ধা মাকেও নিজের বাসায় এনে রাখেন তিনি। এরই মধ্যে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে যাওয়ার সুযোগ জোটে তার কপালে। গত ৩০শে মে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যান মনোয়ার। সেখানে ভালোই কাটছিল তার দিন। প্রায় প্রতিদিনই স্ত্রী, সন্তান, মাসহ নিকটাত্মীয়দের কাছে ফোনে খোঁজ খবর নিতেন তিনি। এক বছরের জন্য শান্তিরক্ষা মিশনে মালি যাওয়া মনোয়ারের স্বপ্ন ছিল সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার।
সব শেষ শনিবার বাবার সাথে ফোনে কথা বলার সময় আঙ্গুর, আপেল আর আম নিয়ে আসার বায়না ধরেছিল বড় মেয়ে ইলমুন। কিন্তু আপেল, আঙ্গুর আর আম নিয়ে বাবা আর আসবেনা মেয়ের কাছে। স্ত্রীকে বলেছিলেন তিনি ভালো আছেন, সন্তানদের দেখে শুনে রাখতে। রোববার বিকালে এক খবরে সব কিছু এলামেলো হয়ে যায় সৈনিক মনোয়ারের পরিবারের। তারা জানতে পারেন, রোববার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টার দিকে মালিতে টহল কার্যক্রম শেষে ক্যাম্পে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের শক্তিশালী হামলার শিকার হন শান্তিরক্ষীরা। তারা সফলতার সঙ্গে সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধ করেন। কিন্তু এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা আইইডি বিস্ফোরণে ৩ বাংলাদেশি সৈনিক নিহত এবং এক মেজরসহ ৪ জন আহত হন। মনোয়ার নিহত হওয়ার খবর নিকটাত্মীয়রা প্রথমে স্ত্রী এবং তার মায়ের কাছে চেপে গেলেও নানা পারিপার্শ্বিকতায় তারা বুঝে গেছেন তাদের মনোয়ার আর নেই। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মনোয়ার খুবই মিশুক এবং শান্ত প্রকৃতির লোক ছিল। অল্পতেই মানুষের মন জয় করতে পারতেন। তার মৃত্যুর খবরে বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন পুরো এলাকার মানুষ। তারা মনোয়ারের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন। মনোয়ারের স্বজনরা সরকারের কাছে তার লাশটি দ্রুত দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং তার স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা