হঠাৎ ছুটি

40

ষোড়শ সংশোধনীর রায় প্রকাশের পরপরই তৈরি হয়েছিল উত্তাপ। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর ছিলেন সরকারি দলের নেতারা। সংসদের ভেতরে-বাইরে দাবি উঠেছিল, তার পদত্যাগের। তৈরি হয়েছিল নানা গুঞ্জন। আগস্ট মাসের পুরোটা সময় জুড়েই আলোচনায় ছিলেন প্রধান বিচারপতি। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শুরুর পর আলোচনা-সমালোচনা কিছুটা মিইয়ে এসেছিল। এরইমধ্যে বিদেশ সফরও করে আসেন বিচারপতি সিনহা।
এক মাসের বেশি সময়কার লম্বা অবকাশ শেষে সুপ্রিম কোর্ট খোলার ঠিক আগের দিন গতকালও নিজ দপ্তরে আসেন প্রধান বিচারপতি। বলাবলি রয়েছে, এ সময় তিনি অনেকটা নাটকীয়ভাবে ছুটিতে যাবার সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এরপর দুপুর তিনটার দিকে তিনি আদালত এলাকা ত্যাগ করেন। এরআগেই খবর ছড়িয়ে পড়ে, প্রধান বিচারপতি এক মাসের ছুটিতে যাচ্ছেন। অবহিতপত্র পাঠানো হয়েছে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের কাছে। প্রধান বিচারপতির অবহিতের চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বিকাল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে প্রধান বিচারপতির চিঠি যায় আইন মন্ত্রণালয়ে। আইনমন্ত্রী ও আইন সচিবের স্বাক্ষরের পর তা পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। একটি সূত্রে জানা গেছে, ছুটির ক্ষেত্রে অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট খোলার ঠিক আগের দিন ‘নজিরবিহীনভাবে’ প্রধান বিচারপতি কেন দীর্ঘ ছুটিতে গেলেন তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। আজ সুপ্রিম কোর্ট খোলার দিনে বিচারক ও আইনজীবীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা ছিল প্রধান বিচারপতির। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, তারা শুনেছেন প্রধান বিচারপতি হঠাৎ করে ছুটির কথা জানিয়েছেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ কোনো আমলেই আদালত খোলার প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, কোনো চাপে নয়, ব্যক্তিগত কারণে ছুটি নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তবে প্রধান বিচারপতি কেন ছুটিতে গেলেন সে কারণ জানা নেই বলে মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
ওদিকে, সোমবার বিকাল থেকেই রাজধানীর হেয়ার রোডের প্রধান বিচারপতির বাসভবন ঘিরে ছিলো উৎসুক মানুষের ভিড়। মিডিয়াকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকের সদস্যদের তৎপরতা ছিল বেশ। এক পর্যায়ে সাদা রঙের ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৩৮২৩৬ নম্বরের একটি গাড়িতে এসে হাজির হন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদিন ও সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন। উদ্দেশ্য প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ। তবে নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ ছাড়াই ফিরে যান তারা। এসময় জয়নুল আবেদীন বলেন, দীর্ঘদিন পর সুপ্রিম কোর্ট খুলছে আগামীকাল। কিন্তু হঠাৎ করে প্রধান বিচারপতি ছুটিতে চলে যাচ্ছেন। জাতি আজ উদ্বিগ্ন। দীর্ঘদিন ছুটি কাটিয়ে আবার কেন ছুটিতে। তিনি বলেন- জনগণ আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করতে পারে। আজ সুপ্রিম কোর্ট যখন খুলবে তখন আইনজীবীরা আমাদের কাছে জানতে চাইতে পারে। কারণ আইনজীবীরা যখন ভোট দিয়ে আমাদেরকে নির্বাচিত করেছে। সুতরাং তারা প্রকৃত ঘটনা জানতে চাইবে। আমরা ইতিপূর্বে বলেছিলাম আমরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করবো। তাই এখন আমরা দেখা করতে এসেছি। আমাদেরকে প্রথমে নিরাপত্তাকর্মীরা বলেছিলেন, প্রধান বিচারপতি অসুস্থ। তিনি দেখা করতে পারবেন না। তখন আমরা বলেছিলাম অসুস্থ হলেও আমরা দেখা করবো, আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি অসুস্থ আর আমরা হলাম সুপ্রিম কোর্টের প্রতিনিধিদের সভাপতি, সম্পাদক। আমাদের দায়িত্ব রয়েছে তিনি কী রকম অসুস্থ আমরা সেটা দেখতে চাই। তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পরে একই নিরাপত্তাকর্মী আবার জানিয়েছেন তিনি অসুস্থ নন। তবে এই মুহূর্তে তিনি সাক্ষাৎ করতে অপারগতা জানাচ্ছেন।  তাই সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি আগামীকাল (আজ) এক জরুরি সভার আয়োজন করেছে। দেশবাসী ও আইনজীবীরা উদ্বিগ্ন। সবাই প্রকৃত ঘটনা জানতে চায়। এসময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, প্রধান বিচারপতি ছুটিতে যেতে চাওয়ায় সমগ্র দেশ এবং পৃথিবীতে আজ একটি প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে।
গত ১লা আগস্ট ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় প্রকাশের দুই/একদিন পর থেকেই সরকারি দলের নেতারা একযোগে প্রধান বিচারপতির সমালোচনায় মাঠে নেমে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেন। সংসদও মুখর হয়ে ওঠে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে। সরকারি দলের নেতারা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে। তার পদত্যাগও দাবি করেন। ষোড়শ সংশোধনীর রায় এবং তার কিছু পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে গত ১৪ই সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ওই প্রস্তাব পাসের আগে সংসদে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা আলোচনা হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলো হাইকোর্ট। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল ৩রা জুলাই খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। বাংলাদেশের আদি সংবিধানে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ছিল। পরে চতুর্থ সংশোধনীতে তা প্রেসিডেন্টের কাছে দেয়া হয়। পঞ্চম সংশোধনীতে এই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে দেয়া হয়। প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ দুই বিচারপতির সমন্বয়ে এ কাউন্সিল গঠিত। জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল করে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দিয়ে ষোড়শ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয় ২০১৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর।

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা