হতাশায়ও উজ্জ্বল রুবেল

22

২০০৮ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ দলের দ্বিতীয় ম্যাচ ছিল বিনোনিতে। হাশিম আমলার সেঞ্চুরিতে ৪ উইকেট হারিয়ে ৩৫৮ রান করেছিল প্রোটিয়ারা। এখন পর্যন্ত সেটিই বাংলাদেশের বিপক্ষে তাদের দলীয় সর্বোচ্চ। ৯ বছর পর পার্ল-এর বোল্যান্ড পার্কে গতকাল তারা নিজেদের সেই রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছিল এবি ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটিং ঝড়ে। কিন্তু টাইগার বোলারদের হতাশার সিরিজে জ্ব্বলে উঠলেন রুবেল হোসেন। অভিজ্ঞ এ পেসারের বোলিংয়ে ভিলিয়ার্স থামেন ক্যারিয়ার সেরা ১৭৬ রানে।

তারপর আরো ২ উইকেট নিলে দক্ষিণ আফ্রিকা থামে ৩৫৩ রানে। প্রথম ম্যাচে কোন উইকেট না পেলেও এবার ৬ উইকেট ফেলে টাইগাররা। উইকেট না পাওয়ার আক্ষেপ দূর করেন সাকিব আল হাসান। দলীয় ৯০ রানের সময় তার জোড়া আঘাতে ফিরে যান আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান কুইন্টন ডি কক ও অধিনায়ক ডু প্লেসি। মাটি কামড়ে পড়েছিলেন আমলা। তাকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন ওয়ানডেতে রানে ফেরার লড়াইয়ে থাকা ভিলিয়ার্স। ২২৬ রানের সময় ৮৫ রান করা আমলাকে ফিরিয়ে শুরু রুবেলের। শেষ পর্যন্ত ৬২ রানের খরচায় নিয়েছেন ৪ উইকেট। দেশের বাইরে মাশরাফি বিন মুর্তজার পর চার বার ৪ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব শুধু এই পেসারেরই আছে। সব মিলিয়ে ওয়ানডেতে তিনি ছয় চার উইকেট পেয়েছেন যার ৪ বারই দেশের বাইরে।
প্রথম ওয়ানডেতে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ দল। মুশফিকের সেঞ্চুরিতে ২৭৮ করলেও হেরেছে ১০ উইকেটের রেকর্ড ব্যবধানে। ধারণা করা হচ্ছিল কিম্বার্লির মতোই হবে পার্লের উইকেট। ব্যাটসম্যানরা সুবিধা নিতে পারবেন। তাই দ্বিতীয় ওয়ানডেতে টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, প্রোটিয়াদের ২৮০ বা ৩শ’র মধ্যে বাঁধতে পারলে সুযোগ আসবে। তামিম দলে ফেরায় ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাসও বাড়তি। কিন্তু দুই ওপেনার আমলা ও ডি কক শুরু করেন দারুণভাবে। ৯০ রান তুলে দু’জন বাংলাদেশের বোলারদের হতাশা বাড়াচ্ছিলেন। তবে প্রথম ওয়ানডের মতো রান তোলার গতি ছিল না। তাসকিন আহমেদ, মাশরাফি, রুবেলরা উইকেট না পেলেও চাপে রাখছিলেন। দুই ব্যাটসম্যান খেলেছেন নিয়ন্ত্রিতভাবে, আউট হওয়ার সুযোগও দিচ্ছিলেন না। ১৬ ওভারে বাউন্ডারি হয়েছে মাত্র তিনটি। তখনই ১৮তম ওভারে সাকিবকে খেলতে গিয়ে ভুল করেন ডি কক।  অবশেষে ওয়ানডে সিরিজে প্রথম উইকেটের দেখা পায় বাংলাদেশ। সাকিবের বলটি একটু স্লাাইড করে ঢুকেছে, লাইন মিস করে এলবিডব্লিউ হন ডি কক। ৫ ওয়ানডে পর সাকিব পেলেন উইকেটের দেখা। আগের ম্যাচের সেরা ডি কক আউট ৪৬ রানে। দক্ষিণ আফ্রিকা ১৭.৩ ওভারে ১ উইকেটে ৯০ রান। সেখান থেকে আর একটি রান বাড়ানোর সুযোগ পেলেন না অধিনায়ক ডু প্লেসি। সাকিবের অসাধারণ ঘুর্ণি বলে রানের খাতা খোলার আগেই বোল্ড।
এরপর আবারো আমলার লড়াই। এবার সঙ্গী ভিলিয়ার্স। শত রানের জুটিও গড়ে তোলেন দু’জন। একশ’ রানের আগে দুই উইকেট হারালেও দলকে ২শ’ রানের সীমানা পার করে দেন দু’জন। আমলা হাঁটছিলেন আরো একটি সেঞ্চুরির দিকে। কিন্তু রুবেল হোসেনের গল্পের শুরুটা সেখান থেকেই। ৯২ বলে ৮৫ রান করা আমলা রুবেলের বল একটু সামনে এগিয়ে এসে সিঙ্গেল নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বলটি একটু বাঁক খেয়ে আমলার ব্যাট ছুঁয়ে মুশফিকের হাতে চলে যায়। ২২৬ রানে ৩ উইকেট হারানো দলকে হতাশ হতে দেননি ভিলিয়ার্স। ২০১৬’র পর ওয়ানডেতে আর সেঞ্চুরির দেখা পাচ্ছিলেন না তিনি। তাই বাংলাদেশকে বেছে নিলেন আবারো নিজের পুরনো  চেহারা দেখাতে। ঝড় তুললেন। ১২৪ ম্যাচ খেলা ভিলিয়ার্স তুলে নিলেন ক্যারিয়ারের ২৫তম সেঞ্চুরি। ১০ চার ও এক ছয়ে ৬৮ বলে ১০০। শেষ পর্যন্ত ১০৪ বলে ১৫ চার ও ৭ ছয়ে ১৭৬ রান। প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এটি চতুর্থ সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। গ্যারি কারস্টেনের ১৮৮ রানের রেকর্ড তখন দৃষ্টিসীমায়। হাতে রয়েছে ৩টি ওভারও। কিন্তু হতে হতে হলো না। রুবেল রুখে দিলেন ভিলিয়ার্স ও প্রোটিয়াদের রেকর্ড। রুবেলের বলে ভিলিয়ার্স চেষ্টা করেছিলেন আরও একটি ছক্কা হাঁকানোর। ফুল লেংথ বলটিতে উড়িয়ে মেরেছিলেন। সীমানা থেকে ছুটে এসে ক্যাচ নেন সাব্বির। এরপর পরপর দুই বলে দুই উইকেট। ডুমিনিকে ফেরানোর পরের বলে ডোয়াইন প্রিটোরিয়াসকেও আউট করে চতুর্থ উইকেট নেন রুবেল হোসেন। ১৫ চার আর ৭ ছক্কা হাঁকান ভিলিয়ার্স।
প্রথম ম্যাচের মতো অধিনায়ক মাশরাফিসহ ৭ বোলার বল করেছিলেন। এর  মধ্যে মাশরাফি ৮২ ও তাসকিন ৭১ রান দিয়ে এ  ম্যাচেও রইলেন উইকেট শূন্য। গতকাল দলে ছিলেন তিন পেসার। সাকিবের পাশাপাশি নাসির, মাহমুদুল্লাহ ও সাব্বিরসহ চার স্পিনারকে ব্যবহার করেন অধিনায়ক। কিন্তু এর মধ্যে ৬০ রান খরচ করলেও সাকিবের প্রাপ্তি ২ উইকেট। দেশের বাইরে এখন পর্যন্ত বোলারদের মধ্যে একবার পাঁচ উইকেট ও ৪ বার চার উইকেটের মালিক ছিলেন শুধু মাশরাফি। গতকাল চতুর্থবার চার উইকেট নিয়ে মাশরাফিকে ছুঁলেন রুবেল। ৭৯ ম্যাচের ক্যারিয়ারে রুবেলের শিকার এখন ৯৭ উইকেট। উইকেটের সেঞ্চুরি হতে বাকি আর ৩ উইকেট। রুবেল ও মাশরাফির পর দেশের বাইরে ২ বার করে ৪ উইকেট পেয়েছেন পাঁচ বোলার। এর মধ্যে রাজ্জাক ও সাকিব দুই স্পিনার বাকিরা পেসার। মাশরাফি ছাড়াও দেশের বাইরে পাঁচ উইকেট আছে জিয়াউর রহমান ও আবদুর রাজ্জাকের।