হতাশায় চিংড়িচাষিরা

35

চিংড়ি চাষ করে এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের। হাজার টাকা দরের চিংড়ির কেজি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০ টাকায়। এছাড়া নানা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে চিংড়ি চাষ এখন হুমকির মুখে। এ অবস্থায় বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার হাজার হাজার চিংড়িচাষি এখন চরম হতাশায় ভুগছেন। গত ২ যুগ ধরে এলাকার চাষিরা এটি চাষ করে লাভের মুখ দেখলেও বর্তমানে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে শত শত চিংড়িচাষি এখন পথে বসতে চলেছে। ফলে এসব চাষির অনেকে এখন দেনার দায়ে ঘরছাড়া হচ্ছেন। এতে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন এলাকার চিংড়িচাষিরা। স্থানীয় চিংড়িচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাদাসোনা খ্যাত চিংড়ি রপ্তানির মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়ে থাকে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এখানকার চিংড়িচাষিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বিদেশে রপ্তানিকৃত চিংড়ির সিংহভাগ দক্ষিণাঞ্চল তথা এই এলাকায় চাষ হয়ে থাকে। এখানকার আবাদি-অনাবাদি জমিতে ঘের তৈরি করে গলদা, বাগদা ও রুই, কাতলসহ নানা জাতের মাছ চাষ করে চাষিরা লাভবান। যার ফলে মাছ চাষের উপর এখানকার অধিকাংশ পরিবার নির্ভরশীল। এখানকার নারী-পুরুষ সকলেই সমানতালে দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন চিংড়ি ঘেরের পেছনে। বর্তমানে সে শ্রম বৃথা যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে পর পর বন্যা ও অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টিতে চিংড়ি চাষে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে প্রতিকূল আবহাওয়া ও নানা বিরূপ পরিস্থিতি তাদের সব স্বপ্ন ম্লান করে দিচ্ছে। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির কারণে চাষিরা চিংড়ির ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করে বিদেশে সুনাম ক্ষুণ্ন করার ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো এদেশের চিংড়ি ক্রয়ে আগ্রহ হারাচ্ছে। পাশাপাশি ঘেরে বিষ দিয়ে চিংড়ি চুরি ও নিধনের প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। এলাকার অধিকাংশ ঘের মালিকের মাঝে বর্তমানে বিষ দেওয়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে। অসংখ্য ঘেরে এ বছর বিষ দিয়ে চিংড়ি নিধন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ জানান অনেকে। নানাভাবে বড় ধরণের প্রভাব পড়ছে চাষিদের উপর। বর্তমানে চাষিরা বাজারে পুরোদমে বিক্রির জন্য ঘের থেকে চিংড়ি বাজারে তুললেও কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নানাভাবে কারসাজির মাধ্যমে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে চিংড়ির বাজার দর নিম্নমুখী করে রেখেছে বলে অভিযোগ চাষিদের। এতে হাজার টাকা কেজি দরের চিংড়ি মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় ঋণগ্রস্ত চাষিদের লাভের মুখ দেখা দূরে থাক মহাজনদের দেনা শোধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান অনেকে। এছাড়া চিংড়ি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, হ্যাচারির েভেজাল রেণু পোণা কিনে প্রতারিত হচ্ছেন অনেকে। পাশাপাশি ভাইরাস ও নানা রোগ-বালাইয়ে চিংিড়ি ঘেরে মড়ক লেগে নিঃস্ব হচ্ছেন চাষিরা। সামনের দিনে বেঁচে থাকার মতো আর কোনো অবলম্বন নেই অনেকের। এলাকার বেশিরভাগ চিংড়িচাষি বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও এবং কারেন্ট সুটে মহাজনদের কাছ থেকে টাকা এনে চাষাবাদে ব্যয় করেছেন। কিন্তু এখন দেনা শোধ করবার মতো কোনো উপায় দেখছেন না তারা। গত আগস্ট মাসে ভয়াবহ বন্যায় সর্বস্বান্ত করে রেখে গেছে এখানকবার চাষিদের। সে লোকসান কাটিয়ে ওঠার যে স্বপ্ন ছিল চাষিদের সেটি এখন ভেস্তে যেতে বসেছে। এতে এখানকার চাষিদের মাঝে শুধু হতাশা বিরাজ করছে উপজেলার সদর ইউনিয়নের কালশিরা গ্রামের চিংড়িচাষি মিলন মণ্ডল, সাধন অধিকারী ও চরবানীয়ারী ইউনিয়নের শ্যামপাড়া গ্রামের চাষি শওকত শেখ, প্রদীপ বৈরাগীসহ অনেকে জানান, বাজারে চিংড়ি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি বৃদ্ধি হচ্ছে দিন দিন অথচ চিংড়ির বাজারদর একেবারে কমে যাচ্ছে, হাজার টাকা কেজি দরের চিংড়ি বর্তমানে মাত্র ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া এলাকায় বিষ দিয়ে চিংড়ি চুরি ও নিধনের যে প্রবণতা বেড়ে গেছে। এতে চাষিদের বেঁচে থাকার মতো কোনো উপায় নেই। এ অবস্থায় অনেকে দেনার দায়ে বর্তমানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিপুল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, চিংড়িতে বিভিন্ন অপদ্রব্য পুশ করার কারণে বাইরের দেশগুলো এদেশের চিংড়ি কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে। এতে করে বাজারে এর দামের প্রভাব পড়ছে।

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা