‘হস্তক্ষেপমুক্ত নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না’

26

নিরপেক্ষ ও হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। আর বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়ে এ কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের ৭৯৯ পৃষ্ঠা দীর্ঘ রায়ে, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, বিচার ব্যবস্থা, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলা হয়েছে।
এতে নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘আদালত লক্ষ্য করেছেন প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই পরাজিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আর সংসদে সহযোগিতা করেনি বিরোধী দল। শেষমেশ ১০ম সংসদীয় নির্বাচনে এসে অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনেই অংশ নেয়নি। এই আদালত এমনটা ভেবেছিল যে, অবাধ ও সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের শূন্যপদগুলো সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হবে। এক্ষেত্রে কোনো সরকারই পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোও সংসদে বা অন্য কোনো ফোরামে এ ইস্যুটি উত্থাপন করেনি। এর ফলে নির্বাচন কমিশন এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। নিরপেক্ষ ও হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন একটি সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা না গেলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। ফলে আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সংসদ অবিকশিতই রয়েছে। জনগণ এই দুই প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা স্থাপন করতে পারে না। আর জনগণের আস্থা ও সম্মান অর্জনের লক্ষ্যে এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলে কোনো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না বিজ্ঞ রাজনীতিকদের সমন্বয়ে সংসদ হবে না এবং এটা সংসদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।’
সংসদ নিয়ে রায়ে বলা হয়, ‘সংসদ যদি যথেষ্ট পরিণত না হয় তাহলে সংসদকে উচ্চতর বিচারিক ব্যবস্থার বিচারক অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হবে আত্মঘাতী চেষ্টা। বিচার ব্যবস্থাকে সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা উচিত নয়। এছাড়া, রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া উচিত।’ আদালত বলেছেন, ‘পরিণত গণতন্ত্রের দেশগুলোতেও যেখানে কিনা নির্বাচন পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং সাংসদরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে নির্বাচিত হন, তারাও সঠিকভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে উচ্চতর আদালতের বিচারকদের অপসারণের কাজ করতে পারেনি। এটা এমন একটি দেশে প্রত্যাশা করা যায় যে দেশ নিম্নবর্ণিত অপরিহার্য উপাদান সমৃদ্ধ সাংবিধানিক গণতন্ত্র দিয়ে পরিচালিত: (১) নির্বাচনের অখণ্ডতা, (২) শাসনে সততা, (৩) ব্যক্তিগত মর্যাদার পবিত্রতা, (৪) আইনের শাসনে শ্রদ্ধা, (৫) বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা (৬) বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা (৭) এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের চারিত্রিক অখণ্ডতা এবং শ্রদ্ধালাভের উপযুক্ততা।’
মঙ্গলবার প্রকাশিত এ রায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া সংশোধনীকে বাতিল করেন আদালত।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ষোড়শ সংশোধনী এনেছিল সরকার। ওই সংশোধনী হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়। ২০১৬ সালের মে মাসে হাইকোর্ট ঘোষণা দেয় যে, ওই সংশোধনী অসাংবিধানিক এবং অকার্যকর। সরকার ওই রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে আপিল করে। আপিল বিভাগ ৩রা জুলাই আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। রায়ের পর এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে সংসদে বক্তব্য রাখেন এমপিরা। এ প্রসঙ্গেও মঙ্গলবার প্রকাশিত রায়ে কথা বলেছেন আদালত। বলা হয়েছে, ‘হাইকোর্টের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া থেকে লক্ষ্য করে যে, সাংসদরা সংসদে ওই রায় ও বিচারকদের সমালোচনা করে আলোচনা করেন।’ ‘অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করে’ বিচারকদের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় বলে মঙ্গলবার প্রকাশিত রায়ে উল্লেখ করা হয়। আদালত বলেন, ‘এতে প্রমাণিত হয় যে, আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিণত এবং পরিণতি অর্জন করতে হলে কমপক্ষে টানা ৪/৫ মেয়াদ সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চা করা প্রয়োজন।’
এখানে আদালত ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক দু’টি ঘটনা তুলে ধরেন। আদালত বলেন, ‘দুদেশেরই সংসদ সদস্যরাই সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন এবং কোনো কিছু নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, যদিও আদালতের ওই সিদ্ধান্তগুলো ছিল সংবেদনশীল।’ এখানে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে সাবেক ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার কথা উল্লেখ করা হয়।
ভারসাম্যের অভাবে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে সরকার
ভারসাম্য আর কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে উদ্ধত আর অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে সরকার। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়ে এমনটাই বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের রায়ে আরো বলা হয়েছে, ‘মানবাধিকার হুমকির মুখে, দুর্নীতি অবাধ, সংসদ অকার্যকর, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত কয়েক কোটি মানুষ আর প্রশাসনে অব্যবস্থাপনা মারাত্মক।’
আদালত বলেছেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন আর অপরাধের পরিবর্তনশীল মাত্রায় নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তা অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে। রায়ে বলা হয়, ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম নয় আর এসবের সামগ্রিক ফল হলো একটি পঙ্গু সমাজ, এমন একটি সমাজ যেখানে একজন ভালো মানুষ ভালো কোনো স্বপ্ন আদৌ দেখে না। কিন্তু মন্দ লোকজন আরও কিছু সুবিধা আদায় করে নিতে নিরন্তর প্রচেষ্টায় রয়েছে।’ রায়ে আরো বলা হয়, ‘এমন একটি পরিস্থিতিতিে, নির্বাহীরা উদ্ধত আর অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে আর আমলাতন্ত্র কখনই কার্যকর হওয়ার দিকে ঝুঁকবে না।’
আদালত বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও আমরা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সক্ষম হইনি। ভারসাম্য নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। কোন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সক্রিয় নয়। ফলে ক্ষমতায় থাকা লোকজন ক্ষমতার আরও অবব্যাবহার করার দিকে ঝুঁকছে আর তারা ক্ষমতার যথেচ্ছা ব্যবহারের ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে।’
রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বিচার ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেছে। অশেষ এই চ্যালেঞ্জের মুখে, বিচারব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে রাষ্ট্রের একমাত্র স্বতন্ত্র অঙ্গ যা তলিয়ে যাওয়া অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও ভেসে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। রায়ে বলা হয়, ‘বিচার ব্যবস্থাও এ পরিস্থিতিতে বেশিদিন টিকতে পারবে না। তারপরও উচ্চতর বিচারিক ব্যবস্থায় বিচারক নির্বাচন ও নিয়োগের জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। উচ্চতর বিচারিক ব্যবস্থার বিচারকদের জন্য পক্ষপাতহীনতার প্রশিক্ষণের কোন সুযোগ নেই। বিচারক নির্বাচন ও তাদের প্রশিক্ষণের জন্য আইন প্রণয়ন করার সময় এসেছে যেন তারা ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হতে পারে।’ বলা হয়, ‘বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে নির্বাহীরা এখন তা খোড়া করে দেয়ার চেষ্টা করছে। আর সেটা যদি হয় তাহলে পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।’
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও কথা বলেছে। বলা হয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আজকাল গুটিকয়েক লোকের একচেটিয়া ব্যবহারের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা জোরালো করার এই আত্মঘাতী প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। আদালতের ভাষায়, ‘ক্ষমতার লোভ মহামারির মতো। একবার এসে গেলে তা সবকিছু গ্রাসের চেষ্টা করবে। এটা যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল না- তা বলাই বাহুল্য। আমাদের পূবর্-পুরুষেরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিল, কোনো ক্ষমতা-দানব তৈরি করা নয়।’
আদালত সর্বশেষ দুই সামরিক শাসক গোষ্ঠীরও সমালোচনা করেন। এতে বলা হয়, স্বাধীনতার পর এসব ক্ষমতালোভী অশুভ জোটগুলো দু’বার দেশকে ‘ব্যানানা রিপাবলিকে’ নামিয়ে আনে। তাদের ক্ষমতার অন্যায় ব্যবহারকে বৈধতা দিতে জনগণকে ধোঁকা দেয়া হয়েছিল আর বিপদগ্রস্ত করা হয়েছিল।
আদালত বলেন, ‘তারা জনগণের ক্ষমতায়ন করেনি। বরং তারা তাদের অবস্থানের অপব্যবহার করেছে এবং নিজেদের ক্ষমতার খেলা দীর্ঘায়িত করতে ধোঁকা দেয়ার বিভিন্ন হাতিয়ার (কখনও গণভোট, কখনও কারচুপির ভোট আর কখনও কোনো নির্বাচনই নয়!) উপস্থাপন করেছে। ফলে, একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘রাজনীতি’র ধারণা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।’
রাজনীতি প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে, ‘রাজনীতি এখন আর ফ্রি নেই। এটা এখন অত্যন্ত বাণিজ্যিক আর চালকের আসনে রয়েছে অর্থ যা কাজের ধারা এবং এর গন্তব্য নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এখন নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতা, মেধা নয়। পরিহাসের বিষয় হলো, অটল সংকল্প আর অদম্য উদ্যম নিয়ে আমরা দেশকে একটি সামরিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের থাবা থেকে মুক্ত করতে পেরেছিলাম, কিন্তু আমরা সেই দেশে নিজেদের কাছেই পরাজিত।’
সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, পরিণত গণতন্ত্র, আমলাতন্ত্র এবং বিচারিক ব্যবস্থার দেশগুলো, উদাহরণস্বরূপ ভারতে সাংসদ, সংসদ এবং আমলাতন্ত্রের তীব্র সমালোচনা করা হয়। আর নির্দিষ্ট কিছু সীমার মধ্যে হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতের বিচারকদের সমালোচনা করা হয়। আদালত বলেন, ‘গণতন্ত্র, আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের যে মানদণ্ড তারা স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে সেটা তুলনা করলে আমরা কোনভাবে তাদের সঙ্গে তাল মেলানোর কথা চিন্তাও করতে পারি না।’
আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তির গুণ সম্পর্কে ভারতের ‘কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি’তে দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং প্রখ্যাত রাজনীতিক রাজেন্দ্র প্রসাদের এক বিবৃতি উল্লেখ করে সর্বোচ্চ আদালত বলেন, তার অবশ্যই চারিত্রিক অখণ্ডতা থাকতে হবে আর হতে হবে সজ্জন ব্যক্তি।
আদালত বলেন, ‘প্রতিটি আইন হয়তো ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে কিন্তু একজন সাংসদের যদি ওই গুণগুলো থাকে যেগুলো তার থাকা প্রয়োজন, তাহলে ধাপে ধাপে গণতন্ত্রের কাঠামো শক্তিশালী করা সম্ভব। এটাই ছিল ওই লাখ লাখ মানুষের ঐকান্তিক প্রত্যাশা যারা এমন একটি দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিল যেখানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন থাকবে। এই আস্থাটা ফিরিয়ে আনতে হবে। সেটা করতে ব্যর্থ হলে স্বাধীনতা হবে অর্থহীন।’