হামাস-ফাতাহ সমঝোতা চুক্তি: আশার আলো দেখছে গাজাবাসী

30

বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনের দুই বিবদমান রাজনৈতিক গোষ্ঠী হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি যখন হলো, গাজার অনেক অধিবাসী সড়কে নেমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। বাকিরা অবশ্য সতর্ক। এখনই আনন্দে গা ভাসিয়ে দিতে রাজি নন। কিন্তু অবস্থান যার যা-ই হোক, সবারই চাওয়া এক। অবসান হোক দুই পক্ষের মধ্যকার দশকের পর দশক ধরে চলা দ্বন্দ্ব। সবাই এই বিষয়ে একমত যে, হামাস ও ফাতাহর দ্বন্দ্ব ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চরম ক্ষতি করেছে। দুই পক্ষের মধ্যে সাম্প্রতিক চুক্তি তাই বহু গাজাবাসীর কাছেই আশাজাগানিয়া।
মিশরের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তি অনুযায়ী, ফাতাহ নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ১লা ডিসেম্বর থেকে গাজা শাসন করবে। ২০০৭ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও তাদের নিরাপত্তা বাহিনী গাজা থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়। গাজা চলে যায় হামাসের নিয়ন্ত্রণে। আইনসভা নির্বাচনে হামাস জয়ী হওয়ার ঠিক এক বছর পর এই ঘটনা ঘটে।
বিবিসির কাছে নাঈম আল-খাতিব নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘হামাস কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করছে, যেটা নজিরবিহীন। ফলে আমরা আশাবাদী কারণ আমরা দেখছি যে, নেতারা বাস্তববাদী হচ্ছে। নিজেদেরকে বৈশ্বিক ইসলামী গোষ্ঠীর অংশ ভাবার বদলে ফিলিস্তিনি ভাবতে শুরু করেছে।’ তিনি অবশ্য এ-ও বলেন, ‘এখনও অনেক কঠিন ইস্যু মোকাবিলা করার বাকি। তারপরও, মীমাংসার বিপরীত পরিণতি বরণ করতে চাই না আমরা।’
সম্প্রতি, প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস হামাসের ওপর ব্যপক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করলে দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদ তুঙ্গে উঠে। ভুগতে থাকে গাজার ২০ লাখ বাসিন্দা। মাহমুদ আব্বাসের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গাজা তীরের একমাত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জ্বালানীর ওপর বিপুল কর আরোপ করে। এমনকি ইসরাইল থেকে যে বিদ্যুৎ গাজায় যায়, তার পরিমাণও তিনি কমিয়ে দেন। ফলে গাজায় প্রতিদিন বিদ্যুৎ সরবরাহ কয়েক ঘণ্টায় নেমে আসে। পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদেও ঘাটতি দেখা দেয়। সেখানে কর্মরত রয়েছে ৬০ হাজার সরকারী কর্মকর্তা। তারা মাসিক বেতন পান ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ থেকে। মাহমুদ আব্বাস এই কর্মচারীদের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনেন। এমনকি ঔষুধ সরবরাহেও বাধা দেয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
দু’ পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হওয়ায় আশা করা হচ্ছে, কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে। স্থানীয় শিক্ষক আমাল বলেন, ‘আমরা আশা করি বিদ্যুৎ অনতিবিলম্বে ফিরে আসবে। আমাদের স্বাভাবিক জীবনের মূল ভিত্তি হলো বিদ্যুৎ।’
উল্লেখ্য, হামাস গাজার দখল নেওয়ার পর এই তীরের ওপর নিজেদের অবরোধ আরও কঠোর করে ইসরাইল ও মিশর। কিন্তু নতুন চুক্তির ফলে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ফের যাবে সীমান্ত অঞ্চলে। তাই মানুষ ও পণ্য পরিবহণ কিছুটা সহজ হবে।
আমাল আরও বলেন, ‘নির্বিঘেœ গাজায় প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হয়ে পশ্চিম তীর, মিশর বা ইসরাইলে স্বাস্থ্য কিংবা শিক্ষার উদ্দেশ্যে যেতে চাই। এটি নিশ্চিত হলেই আমরা মনে করবো সমঝোতা আন্তরিকভাবেই হয়েছে।’
তবে, অতীতের সমঝোতা চুক্তিগুলো দ্রুতই ভেস্তে গিয়েছিল। মিশরের সর্বশেষ ঘোষণায়ও বলা নেই, দুই পক্ষের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ কীভাবে নিষ্পত্তি হবে। যেমন, হামাসের ২৫ হাজার সদস্যের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আল-কাশেম ব্রিগেডের কী হবে, তা নিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
আরেক সমস্যাও আছে। হামাসকে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ হলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় অর্থ জোগানদাতা। ফলে হামাস ও ফাতাহর মধ্যে ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও, তাতে সমর্থন দিতে বেগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ।
কায়রোয় ২১ নভেম্বর ফিলিস্তিনের সব রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই এসব জটিল সমস্যা নিরসনের জন্য আলোচনা হবে। প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ নামে একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুস্তাফা বারঘৌতি বলেন, ‘যা হয়েছে এখন পর্যন্ত, তা ইতিবাচক। কিন্তু এটি সবে শুরু। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যেসব বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, তা এখন বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু হামাস ও ফাতাহ নয়, ফিলিস্তিনের সকল পক্ষকেই এরপর একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার ও পরবর্তী নির্বাচনের তারিখ নিয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে।’
কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলছে যে, সব ঠিকঠাক থাকলে, প্রেসিডেন্ট আব্বাস মীমাংসা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শিগগিরই গাজা যাবেন, যেটি হবে এক দশকের মধ্যে তার প্রথম গাজা সফর।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, সমগ্র ফিলিস্তিনে আব্বাসের পদত্যাগের পক্ষে মত দিয়েছেন ৬৭ শতাংশ ভোটার। গাজায় এই হার ৮০ শতাংশ। মজার ব্যাপার হলো, অনেক ভাষ্যকার বলছেন, ঠিক এ কারণেই এবারের সমঝোতা প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ৮২ বছর বয়সী আব্বাস মনে করছেন, তার হারানোর কিছু বাকি নেই। আবার তিনি চান ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখাতে। কিছু একটা করে রেখে যেতে চান তিনি, যার কারণে মানুষ তাকে মনে রাখবে।
অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ঘটনাচক্রে নিজেদেরকে প্রতিকূল অবস্থায় খুঁজে পেয়েছে হামাস, যাদেরকে মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক শাখা ভাবা হয়। ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হয়ে সাহায্যের জন্য কায়রোর দ্বারস্থ হয়েছে হামাস। দৃশ্যত, সংগঠনটি এই অবস্থা থেকে উত্তরণে মরিয়া।
অপরদিকে গাজা সীমান্তবর্তী সিনাই উপত্যাকার নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে মুখিয়ে থাকা মিশরের নেতারাও সুযোগটি লুফে নিয়েছেন। মিশর চায় আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে। সেই লক্ষ্য অর্জনে হামাস ও ফাতাহর সমঝোতা আলোচনায় মধ্যস্থতা করার চেয়ে ভালো সুযোগ আর হতেই পারে না।
(বিবিসি অবলম্বনে)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা