১৬তম সংশোধনীর রায়ে একটি নির্বাচনী গাইডলাইন

35

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে সংসদের কাছে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা না থাকার কারণ হিসেবে যেসব কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে নির্বাচনও রয়েছে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তার রায়ে নির্দিষ্ট
করে দেখিয়েছেন যে, একজন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী স্বার্থ কি করে বিচার ও বিচার বিভাগের প্রতি হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তার কথায় কোনো একটি সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করার পরে সেই নির্বাচনের বৈধতা শুধুমাত্র ‘নির্বাচনী দরখাস্তের’ মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। এটাই বাংলাদেশের প্রচলিত আইন। এই আইন বলছে, ইলেকশন পিটিশন কেবলমাত্র হাইকোর্টের বিচারকদের কাছেই করা যাবে।
সুতরাং অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে, একজন কর্মরত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা নির্বাচনী দরখাস্ত যখন হাইকোর্টে শুনানি শুরু হবে ততদিনে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়ে যাবে। আর কর্মরত একজন হাইকোর্টের বিচারক সেই বিচার পরিচালনায় একধরনের চাপ অনুভব করবেন।
প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ২০১৫ সালের কৃষ্ণমূর্তি বনাম শিবকুমার মামলায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দুর্বৃত্তায়ন এবং অবাঞ্ছিত প্রভাব রোধ করতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দিপক মিত্র ৫ দফা বিশিষ্ট একটি গাইডলাইন দিয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতি তার রায়ে এই গাইডলাইনের বরাত দিয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই গাইডলাইন মূল রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লিখিত হওয়ার ফলে এটি একটি ‘অবিটর ডিকটার’ মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন চাইলে এই গাইডলাইনকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা লিখেছেন, ‘ওই গাইডলাইনে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলকে মনোনয়নপত্র দেয়ার আগে যেসব বিবেচনা করতে হবে তার মধ্যে:
১. প্রার্থীর ফৌজদারী অপরাধের পূর্ব বৃত্তান্ত বিশেষ করে দুর্নীতি বা নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগের তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. প্রার্থীর এসব তথ্য নির্বাচনের আগে প্রকাশ এবং তা ব্যাপকভাবে প্রচারের সুযোগ তৈরি না হলে নির্বাচনের ফলে তার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ প্রার্থীর বিষয়ে দরকারি তথ্য না জানতে পারলে ভোট দিতে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
৩. এসব তথ্য প্রকাশের কোনো সুব্যবস্থা না থাকলে তা প্রকারান্তরে নাগরিকের অবাধ ভোটাধিকার হস্তক্ষেপ করা হয়।
৪. প্রার্থী যদি তা প্রকাশ না করে তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী যদি জিতেও যান এবং পরে যখনই তা প্রকাশ পাবে তখনই তার নির্বাচন অনভিপ্রেত বলে গণ্য হবে। আর তখন তা ভারতের ১৯৫১ সালের আইনের ১০০ [১(খ)] অনুযায়ী নির্বাচন বাতিল বলে গণ্য হবে।
প্রধান বিচারপতি এরপর উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনেও উল্লিখিত ধরনের স্বার্থের সংঘাতময় একটা পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে। বাংলাদেশের নির্বাচন বিরোধ সংক্রান্ত বিষয় হাইকোর্ট বিভাগ এবং পরে তার বিরুদ্ধে আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ শুনে থাকেন।
আপিল বিভাগের রায়ে এরপর বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সংসদ এবং নির্বাহী বিভাগের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। যদি বিচারকদের অপসারণ পদ্ধতি সংসদের কাছে থাকে, তাহলে এসব মামলার নিষ্পত্তি ন্যায্যভাবে নাও হতে পারে। আর তখন সেটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
প্রধান বিচারপতি স্মরণ করেন যে, ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় দুই মেয়াদে সংসদ নির্বাচন শর্তসাপেক্ষে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে আপিল বিভাগ মত দিয়েছিলেন। তবে শর্ত ছিল অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিকে উপদেষ্টা করা যাবে না। প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ওই রায়ের অর্থ ছিল এটা নিশ্চিত করা যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় যাতে কোনো অহেতুক আঘাত না আসে।
এ প্রসঙ্গে তিনি উদাহরণ হিসেবে ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৪৯ ধারার উল্লেখ করেন।
এই ধারা বলেছে কোনো নির্বাচনকে প্রার্থীর নির্বাচনী দরখাস্ত ব্যতিরেকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না এবং নির্দিষ্ট সময়ের নির্বাচনী দরখাস্ত হাইকোর্ট বিভাগে পেশ করতে হবে।
রায়ের বর্ণনায়, ‘যেসব দেশ বিচারক অপসারণে সংসদীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে তাদের অভিজ্ঞতা করুণ। রাজনীতিকিকরণকৃত এবং কার্যকর নয়। এসব দেশ দেশে বিদেশে বড় রকমের সমালোচনার সম্মুখীন হয়ে থাকে। তাছাড়া সে সব দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। তাদের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমাদের চেয়ে অনেক পরিপক্ব। ১৯৪৭-১৯৭১ আমাদের গণতন্ত্র ছিল না। স্বাধীনতার পরে আমরা শুধু সাড়ে তিন বছর গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছিলাম। এরপর দেশ ইতিহাসের ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখেছিল। শুধু জাতির পিতাই নয় চার বছরের এক শিশুসহ তার সমগ্র পরিবারকে (দু কন্যা বাদে) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। দেশ আবার বন্দুকের খপ্পরে পড়ে যারা সামরিক আইন দ্বারা সন্ত্রাসের রাজত্ব করেছিল। আর তা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বজায় থাকে।