২৮ ‘হিন্দু’র খুনী কে!

39

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করছে, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা হত্যা করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৮ জনকে। এর মধ্যে ২০ জন নারী ও ৮ টি ছেলে শিশু। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা সাধারণ মানুষের ওপর কোনো হামলা চায় নি। কোনো হিন্দুকে হত্যা করে নি। সেনাবাহিনী যে দাবি করেছে তার সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ, রাখাইনে সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও ত্রাণকর্মীদের প্রবেশে কড়াকড়ি রয়েছে। মৃতদেহগুলো উদ্ধার ও এর নেপথ্যে যে রোহিঙ্গারা রয়েছে তা কোনো নিরপেক্ষ মাধ্যম থেকে নিশ্চিত করা হয় নি। ফলে সেনাবাহিনী তথা মিয়ানমার সরকারের এমন দাবি নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের অনুপস্থিতিতে তারা মৃতদেহ উদ্ধার করে এ দাবি করলেও প্রশ্ন সামনে আসছে আসলে এদেরকে হত্যা করেছে কে বা কারা? এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেসব ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে তাতে উল্টো আরো দেখা যায়, সেনাবাহিনী, বৌদ্ধ উগ্রপন্থিরা কিভাবে মানুষ হত্যা করছে বা করেছে। নারী, যুবতীদের কিভাবে পুরোপুরি নগ্ন করে কিভাবে নৃশংস উপায়ে হাত, পা, স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো বিচ্ছিন্ন করে অত্যাচার চালানো হচ্ছে। কিভাবে তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে। কারা এসব হত্যাকা- চালাচ্ছে তা ওইসব ছবি, ভিডিওতে স্পষ্ট। কোনো কোনো ভিডিওতে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরা সদস্যরা অত্যাচার করছে। এই যখন অবস্থা তখন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা ২৮ হিন্দু গ্রামবাসীর মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। তাদের আরও দাবি, এসব মানুষকে গত মাসে হত্যা করেছে রোহিঙ্গা মুসলিম বিদ্রোহীরা। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বলছে, গত মাসে যখন সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করে তখন রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা এসব মানুষকে হত্যা করেছে। তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। মিয়ানমার সরকার বলছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এক শরণার্থী মিয়ানমারের হিন্দু সম্প্রদায়ের এক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপরই রাখাইনের উত্তরে ইয়ে বাও কাই গ্রামে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। ওই শরণার্থী তাদেরকে জানিয়েছেন, ২৫ শে আগস্ট ওই গ্রামের প্রায় ১০০ মানুষকে কুপিয়েছে আরসার উগ্রপন্থি সদস্যরা। তাদের প্রায় ৩০০ জন ওই গ্রামে গিয়ে হামলা করে এবং হত্যাকা- চালায়। মিয়ানমার সরকার বলছে, নিহতদের মধ্যে ২০ জন নারী ও আট জন ছেলে শিশু। সরকার আরও দাবি করেছে, হামলাকারীরা ওই বিভিন্ন গ্রামের আটজন নারীকে জোর করে ধর্মান্তরিত করে এবং তাদেরকে বাংলাদেশে নিয়ে গেছে। মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জাও হতাই বলেছেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা এ বিষয়ে তদন্ত করছে। তবে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের যেসব মানুষ পালিয়ে এসেছেন তারাও এ পর্যন্ত এমন কোনো অভিযোগ করেছেন বলে শোনা যায় নি। এরই প্রেক্ষিতে আরসা’র মুখপাত্র বলেছেন, তিনি মনে করেন মিয়ানমারের বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তারা এ জন্যই মিথ্যা বলছে যে, ওইসব গ্রামবাসীকে হত্যা করেছে আরসা’র সদস্যরা। আরসা’র ওই মুখপাত্র নিজেকে শুধু আবদুল্লাহ বলে পরিচয় দেন। একটি ম্যাসেজ সার্ভিসের মাধ্যমে তিনি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আরসা আন্তর্জাতিকভাবে বেসামরিক মানুষকেও টার্গেট করে না। যা কিছুই ঘটুক এ নীতিতে কোনো পরিবর্তন নেই তাদের। উল্লেখ্য, ২৫ শে আগস্ট রাখাইনে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ৩০টি পোস্ট ও ক্যাম্পে হামলা চালায় আরসা সদস্যরা। এতে ১২ জন নিহত হন। এরপরই সেনাবাহিনী রাখাইনজুড়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু করে নৃশংস নির্যাতন। সরকারি হিসাবেই প্রায় ৪০০ মানুষকে হত্যার কথা স্বীকার করা হয়েছে। এর বেশির ভাগই আরসা সদস্য বলে জানানো হয়। তবে এ হিসাব এখন থেকে প্রায় দু’সপ্তাহ আগের। ওই হিসাব দেয়ারও পরও রাখাইনে সহিংসতা চলতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, সেখানে সেনাবাহিনীর অভিযান চলছেই। গ্রামে আগুন জ্বলার তথ্য প্রামাণ্য আকারে উপস্থাপন করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থাগুলো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাখাইনে সরকার জাতি নিধন চালাচ্ছে বলে বর্ণনা করে জাতিসংঘ। এই সহিংসতার মধ্যে পড়ে যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ। তাদের অনেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। তারাও সাক্ষ্য দিয়েছেন সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে। বলেছেন, এরাই সহিংসতা করছে। তবে কেউ কেউ সরকারের গুপ্তচর এমন সন্দেহেও হামলার বিদ্রোহীদের শিকারে পরিণত হয়ে থাকতে পারেন। উদ্ভুত পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে এসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান)। এ সংগঠনের একটি সদস্য দেশ মিয়ানমারও। কড়া নিন্দা জানিয়েছে মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। তবে আসিয়ানের বিবৃতির বিষয়ে নিজেদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফা আমান। তার যুক্তি বাস্তব পরিস্থিতিকে ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে বিবৃতিতে। এতে আক্রান্তদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সনাক্ত করে কোনো কথা বলা হয় নি। উল্লেখ্য, মিয়ানমার এই শব্দটি উচ্চারণে বা ব্যবহার করে না। কারণ, তারা মনে করে রোহিঙ্গারা আলাদা জাতিগোষ্ঠী। তারা মিয়ানমারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। তারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী। তাই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বও দেয় না মিয়ানমার।

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা