৪ দিনের শিশুকে নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড

28

জন্মের পর স্বস্তির নিঃশ্বাসও নিতে পারেনি শিশুটি। পৃথিবীর আলো তার জন্য হয়ে উঠেছে এক বিষাদময় যন্ত্রণা। পিতা-মাতার আদর থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। দুই পরিবার এ শিশুকে নিয়ে শুরু করেছে টানাটানি। তারা শিশুটিকে নিজেদের সন্তান বলে দাবি করেছে। এ অবস্থায় তাকে নিয়ে হয়েছে মামলা। পুলিশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএনএ টেস্টের। এর পরই নির্ধারিত হবে কে তার আসল পিতা? কে তার আসল মা? মাত্র চারদিন বয়সের এ শিশুকে নিয়ে এমন বিষাক্ত খেলায় নেমেছে একটি চক্র। গত ২৩শে সেপ্টেম্বর নরমাল ডেলিভারিতে শিশুটির জন্ম হয় নিজ বাড়িতে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার শ্রীঘর গ্রামের সেন্টু মিয়ার স্ত্রী আনোয়ারার ঘরে জন্ম নেয় ফুটফুটে পুত্রসন্তান। কিন্তু জন্মের পর স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিলে তাকে দ্রুত নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে তাকে নেয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিউ ল্যাব ক্লিনিকে। পরে ওই শিশুকে আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর শিশু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২৫শে সেপ্টেম্বর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওইদিনই রাত ৩টায় শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু শিশু হাসপাতালের এনআইসিইউ বেড খালি না থাকায় হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরামর্শ দেন কোনো প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করার। মঙ্গলবার ভোর ৬টায় শিশুটিকে মোহাম্মদপুরস্থ খিলজী রোডের ২২/১৪বি শ্যামলীস্থ বেবী কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সকাল ৮টায় ওই হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাক্তার এমএম ইউসুফ নবজাতককে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানান, তার অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। শিশুর পিতা সেন্টু মিয়া বলেন, ডাক্তার চলে গেলে বেলা সাড়ে ১০টার দিকে বেবী কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের ম্যানেজার কবির আসেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে। এ সময় সেন্টু ১১ হাজার টাকা বিল প্রদান করেন। এ সময় কবির শিশুর পিতা সেন্টু মিয়াকে জানান, শিশুর উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য কোথাও নিয়ে যাবেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় সেন্টুর নবজাতক শিশু মারা গেছে। একই সঙ্গে তোয়ালে দেয়া মোড়ানো মৃত শিশু তাদের কাছে দেয়। এ সময় সেন্টু মৃত শিশুকে দেখে বলেন, এ শিশু তার নয়। কারণ তার শিশু ছিল নরমাল বেবী। আর ওই শিশুর নাভিতে সুতো বাধা ছিল। তাছাড়া তার সন্তানের মাথার পেছনের দিকে জন্মদাগ ছিল। কিন্তু মৃত শিশুর এসব কিছুই নেই। তাই সেন্টু এ শিশু তার নয় বলে মৃত শিশু গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে মৃত শিশুর নাভিতে লাগানো ছিল ক্লিপ, যা সাধারণত সিজার বেবীদের ক্ষেত্রে লাগানো হয়। এ অবস্থায় বেবী কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকে। তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। তাদের কাছ থেকে মৃত বাচ্চা বুঝে পাওয়ার স্বাক্ষর সংবলিত কাগজ জোর করে ধরিয়ে দেয়। এ অবস্থায় শিশুর পিতা ঢাকায় অবস্থানরত তার স্বজনদের খবর দেন। স্বজনরা এসে বেবী কেয়ার হাসপাতালের প্রতিটি রুম খোঁজ করেন। কোথাও নবজাতককে পাওয়া যায়নি। পরে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের অসংলগ্ন আচরণে আরো সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরে তারা হাসপাতালের রিলিজ বই চেক করেন। সেখানে দেখা যায় দুটি শিশু এরই মধ্যে এ হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়েছে। এরমধ্যে স্বজন একটি শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এ শিশু মেয়ে হওয়ায় তারা ফোন রেখে দেন। অন্যজনকে ফোন দিয়ে জানা যায় এটি ছেলে শিশু। ওই পাশ থেকে জানানো হয় তারা বেরী কেয়ার থেকে এ শিশুকে নিয়ে ধানমন্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করেছেন। তাৎক্ষণিক স্বজনরা সেন্টুকে নিয়ে ওই হাসপাতালে যান। সেখানে সেই নবজাতকের পিতা দাবিদার মো. জহিরুল ইসলাম জানান, তার বাড়ি টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরে। তিনি বলেন, টাঙ্গাইলে জন্ম নেয়া ওই শিশুকে নিয়ে তারা বেবী কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তারা সেখান থেকে ছাড়পত্র নিয়ে এখানে চলে আসেন। তিনি বলেন, কোনো ভুল যদি করে থাকে তাহলে সেটি বেবী কেয়ার হাসপাতাল করেছে। এর দায় আমার নয়। কিন্তু আমার সন্তান তাহলে কোথায়? এ সময় বেবী কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর থানায় অভিযোগ করা হয়। বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই ফিরোজ। সবার উপস্থিতিতে সব কাগজপত্র দেখে এবং বক্তব্য শুনে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হয় নবজাতক পুত্রসন্তান নাসিরনগরের সেন্টুর। কিন্তু নবজাতকের পিতৃপরিচয়ের শতভাগ সত্যতা নিশ্চিতকরণের জন্য সিদ্ধান্ত হয় নবজাতকের ডিএনএ টেস্টের। এর মাধ্যমেই শিশু ফিরে পাবে তার পিতা-মাতা। হাসপাতালের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, নরমাল ডেলিভারি হওয়া নাসিরনগরের শিশুর ওজন দুই কেজি দুইশ’ গ্রাম। আর টাঙ্গাইলের শিশুর ওজন দুই কেজি নয়শ’ গ্রাম। ধানমন্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর ওজনও দুই কেজি দুইশ গ্রাম। আর তার নাভিতে সুতা বাঁধা। মাথার পেছনে রয়েছে জন্মদাগও। বর্তমানে শিশুটি ডাক্তার ও পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। শিশুটি কিছুটা সুস্থ হলে ডিএনএ টেস্ট করার পর তাকে আসল পিতা-মাতার কোলে তুলে দেয়া হবে।

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা