আজ ২৫ জুলাই আন্তর্জাতিক পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস

30

নিজস্ব প্রতিবেদক: দুই বছর বয়সী ছোট্ট শিশু আব্দুর রহমান। সকাল তখন ৯টা। গৃহকর্তা বাড়ীর বাইরে। শিশু আব্দুর রহমানকে ঘরের বারান্দায় বসিয়ে রেখে গৃহস্থালী কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মা। হঠাৎ সবার অজান্তে খেলাচ্ছলে আব্দুর রহমান হাটতে হাটতে বাড়ীর পাশের ডোবায় গিয়ে পড়ে। শিশু রহমানকে দেখতে না পেয়ে মুহুর্তে খোঁজাখুজি শুরু করেন মা। একপর্যায়ে বাড়ীর পাশের ওই ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ১১ জুলাই শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার নবীনপুর গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটে। নালিতাবাড়ী উপজেলার বড়বিলা গ্রামের লালচান মিয়ার ৮ বছর বয়সী মেয়ে লামিয়া বেগমও বাড়ীর পাশের রাস্তার পাশের খাদের পানিতে ডুবে মারা যায়। গত ৫ জুলাই সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। চলতি মাসে শেরপুরের দু’টি উপজেলায় বিচ্ছিন্ন এ দু’টি ঘটনা ঘটলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অহরহ এমন ঘটনা শোনা যায়। পরিবারের সদস্যদের যথাযথ নজরদারি না থাকায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পানিতে ডোবার ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ শিশু বড়দের অগোচরে বাড়ি সংলগ্ন পুকুর বা অন্য জলাশয়ে চলে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়।

পানিতে ডুবে শিশুুমৃত্যুর বিষয়ে তিনটি কারণের উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত: দিনের প্রথম ভাগে অর্থাৎ সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে এ ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। দ্বিতীয়ত: মায়েরা যখন গৃহস্থালী কাজে ব্যস্ত থাকেন, সেই সময়টাতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। তৃতীয়ত: ডুবে যাওয়া শিশুদের অধিকাংশের বয়স ৪ বছর বা তার চেয়েও কম। শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকে বৈশ্বিকভাবে এসডিজি’র অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পানিতে ডুবে মৃত্যুকে অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত করা হয়নি। ফলে অসুস্থতাজনিত কারণে শিশু মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব হলেও পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার প্রতিরোধে কর্মসূচি গ্রহণ না করা হলে সার্বিকভাবে শিশুমৃত্যুর উচ্চহার থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে গ্রামে গ্রামে স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করে দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন একটি কার্যকর উপায় হতে পারে মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া শিশুদের জন্য নজরদারির নিশ্চিত করতে পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনাতা তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি একটি জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যেন সারা দেশে একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

পানিতে ডুবে মৃত্যুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ করছে গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’। জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ের অনলাইন নিউজ পোর্টালের তথ্য পর্যালোচনা করে সংস্থাটি জানায়, ২০২০ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত ১৯ মাসে পানিতে ডুবার ঘটনা ঘটেছে ৯৬৭টি। এসব ঘটনায় সারাদেশে এক হাজার ৩৩২ শিশুসহ মোট এক হাজার ৫৬২ জন ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যায়। সমষ্টি পরিচালক মীর মাসরুর জামান বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর জাতীয়ভাবে কার্যকর তথ্যায়ন ব্যবস্থা না থাকায় বেশিরভাগ ঘটনাই গণমাধ্যমে উঠে আসেনা। যে কারণে অনেকসময়ই প্রকৃত চিত্রও পাওয়া যায়না। এজন্য পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুরোধে আমাদেরকে এখনই কর্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রস্তাবে জাতিসংঘে গৃহীত রেজুলেশন মোতাবেক প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী ২৫ জুলাই ‘আন্তর্জাতিক পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হতে যাচ্ছে। গত ২৮ এপ্রিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে যে ঐতিহাসিক রেজল্যুশন গৃহীত হয় সেটি উত্থাপন করেছিলেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা।

পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি)। সংস্থাটির উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. আমিনুর রহমান সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে জানান, দিনের প্রথমভাগে শিশুদের নিবিড় তত্বাবধানে রাখা হলে বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব। সিআইপিআরবি ও আইসিডিডিআরবি শেরপুর সহ দেশের সাতটি উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু নিয়ে গবেষণাটির তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। গবেষণায় দুই বছর ধরে উপজেলাগুলোর প্রায় ১২ লাখ অধিবাসীর মধ্যে দুর্ঘটনাজনিত আঘাত বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ১ লাখ ২২ হাজার ২৩ জন ১-৪ বছর বয়সী শিশুও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে দেখা গেছে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু ৭০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব যদি শিশুদের দিনের প্রথমভাগে শিশুযত্নকেন্দ্রে নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। গবেষণায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, গ্রামভিত্তিক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র সফলভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে কার্যকরী। এ ধরনের দিবাযত্নের ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো অন্যান্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার দূরীকরণে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা।

এর আগে এক পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুরা ডে-কেয়ার সেন্টার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে তাদের পানিতে ডোবার সম্ভাবনা ৮২ শতাংশ কমে যায়। ওই গবেষণায় আঁচল নামের একটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র ও প্লে পেন নামের আরেকটি উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণসহ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, আঁচল ও প্লে পেন উদ্যোগগুলো পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে খুব কার্যকর। আঁচল ২ বছর এবং তদুর্ধ্ব শিশুদের সুরক্ষায় বেশি সফল। সাধারণত দিনের যে সময়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, সেই সময় শিশুরা আঁচলে সার্বক্ষণিক শিশু পরিচর্যাকারীর নজরদারিতে থাকছে। পাশাপাশি গ্রামভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্যও সহায়ক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে প্রকাশিত প্রিভেন্টিং ড্রাওনিং অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন গাইডেও স্থানীয় পর্যায়ের মানুষজনকে সম্পৃক্ত করে দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। এছাড়া পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি ও জাতীয়ভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করার উপরও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সুপারিশ করেছে। বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, শিশুমৃত্যু রোধে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, এর বেশি বয়সী শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ, ডুবে যাওয়া শিশুকে উদ্ধারের পর প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও মানুষকে সচেতন করার কর্মসূচি নেওয়া জরুরি। এতে খুব বেশি অর্থেরও প্রয়োজন হয় না। কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে ডে-কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে একটি শিশুকে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত (পরিবারের সবাই কাজে থাকায় যে সময় শিশু পানিতে পড়ে) নজরদারিতে রাখতে বছরে খরচ হবে আড়াই হাজার টাকা। একটি শিশুকে সাঁতার শেখাতে খরচ হবে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি জানান, ‘গ্রামভিত্তিক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকার ও দাতা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পাইলট ভিত্তিতে কয়েকটি জেলায় কিছু কিছু কাজ হচ্ছে। শিশু সুরক্ষার জন্য দেশব্যাপী এসব কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এ বিষয়ে ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) প্রণয়ন করা হয়েছে। ডিপিপিটি যাতে দ্রু একনেকে অনুমোদন হয়, সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

Advertisement
Print Friendly, PDF & Email
sadi